Home » ফেইসবুক থেকে » অনলাইন সাংবাদিকতা : খায়েশ বনাম পেশাদারিত্ব

অনলাইন সাংবাদিকতা : খায়েশ বনাম পেশাদারিত্ব

আহমেদ জুয়েল :বাংলাদেশে অনলাইন গণমাধ্যমের পথচলা খুব বেশি দিনের নয়। বলতে গেলে এই গণমাধ্যমটি আঁতুড়ঘরের শেষ পর্যায়টি পার করছে মাত্র। কিন্তু এরইমধ্যে নতুন ধারার এ গণমাধ্যমের কপালে জুটেছে নানা ‘বদনাম’। অপেশাদারিত্ব ও আনাড়িপনা নিয়েও জমেছে কঠোর সমালোচনা। আছে একপেশে ও উস্কানিমূলক সংবাদ প্রকাশের অভিযোগ, শ্লীল-অশ্লীল সংবাদ-ফিচার-ছবি নিয়েও আছে তর্কাতর্কি আর সাংবাদিকতার ‘এথিকস’ নিয়ে বুলি ছড়ানোর লোকের অভাব আগেও ছিল না, এখনো নেই।

জনপ্রতিনিধিসহ ও সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদের ব্যক্তিরাও অনলাইন নিউজ পোর্টালের প্রতি ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন বিভিন্ন সময়। কিছু বুঝে ওঠার আগেই এই ধারার গণমাধ্যমকে কঠোর নিয়মের মধ্যে রাখার কথাও তারা বলেছেন। এমনকি সরকারঘেঁষা সাংবাদিকরাও সে কথা সমর্থন করেছেন। শেষ পর্যন্ত তারা নীতিমালা তৈরিতেও হাত দিয়েছেন। তবে একসময় অনেক তোড়জোড় থাকলেও খসড়া নীতিমালা প্রকাশের পর নানা সমালোচনার মুখে তা আলোর মুখ দেখেনি এখনো। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী এখন সে বিষয়ে আর কোনো কথাও বলেন না।

কিন্তু অনলাইন নিউজ পোর্টালগুলোর বিরুদ্ধে ঢালাও অভিযোগ কেন? পাঠকের সব ধরনের অভিযোগ কি সত্যি? প্রথম প্রশ্নের উত্তর খোঁজার আগে স্বীকার করে নিতেই হবে, পাঠকের উত্থাপন করা সব ধরনের অভিযোগই সত্যি। তবে তা ‘উদোর পিন্ডি বুদোর ঘাড়ে’ চাপানোর মতো অবস্থা আরকি। অপেশাদার পোর্টালগুলোর বদনামের পুরোটাই গিয়ে পড়ছে পেশাদার অনলাইনগুলোর ওপর। বিষয়টি অনলাইনের সব পাঠকের অবশ্যই জানা দরকার আর সমালোচনা যারা করেন, তাদের আরো বেশি করে জানা দরকার। ঢালাও অভিযোগ করে কখনো সমালোচনা হয় না। পাঠক যদি পেশাদার নিউজ পোর্টাল সম্পর্কে না জেনে ঢালাও অভিযোগ করতেই থাকেন, তাহলে নতুন যুগের নতুন এ সাংবাদিকতার ধারার সত্যিকার কর্মীদের বিরুদ্ধে অন্যায় করা হবে।

এখানে একটি প্রকৃত ও ‘ভয়াবহ’ তথ্য উত্থাপন করতে চাই আর তা হলো- বর্তমানে বাংলাদেশে অনলাইন নিউজ পোর্টালের সংখ্যা কমপক্ষে পাঁচ হাজার। এর মধ্যে পেশাদারিত্ব এবং মোটামুটি পেশাদারিত্ব আছে এমন নিউজ পোর্টালের সংখ্যা পাঁচ বা ছয়ের বেশি হবে না (টিভি ও দৈনিক পত্রিকার ওয়েবসাইট বাদে)। অর্থাৎ পাঁচ হাজারে পাঁচটা। শতাংশের হিসাবে তা ০.১ ভাগ। তার মানে হলো ৯৯.৯ ভাগ পোর্টালের পেশাদারিত্ব নেই। এই পোর্টালগুলো অন্য পোর্টালের সংবাদ নির্লজ্জভাবে চুরি করে কিছুটা পরিবর্তন করে বা হুবহু প্রকাশ করে থাকে। এগুলোতে কোনো বিনিয়োগ নেই। প্রয়োজনের তুলনায় নিজস্ব সংবাদকর্মী নেই। এদের একমাত্র মূলধন ওই চৌর্যবৃত্তি। মানে কপি এবং পেস্ট। কপি ঠেকানোর কোনো কার্যকর ব্যবস্থা থাকলে এ পোর্টালগুলোর জন্মের পরই মৃত্যু হতো। হয়তো জন্মই হতো না।

ওই ৯৯.৯ ভাগের দু’চারটাতে কিছুটা বিনিয়োগ থাকার কথা শোনা যায়। পেশাদারিত্ব নিয়েই সেগুলো এগোতে চায়। কিন্তু যোগ্য কর্মীর অভাবে সেগুলো এগোতে পারছে না। মালিক পক্ষেরও পরিকল্পনা আর লক্ষ্যের মধ্যে ঘাটতি থাকায় ভালো সংবাদ কর্মীরা সেখানে ভিড়তেও চাচ্ছেন না। অনেকের ধারণা, কয়েকটা ল্যাপটপ দিয়ে কয়েকজনকে বসিয়ে দিলেই একটা পোর্টাল চালানো যায়। এ জন্য শুরুর দিকে এ অনলাইন সাংবাদিকতাকে অনেকেই ল্যাপটপ সাংবাদিকতা বলে ব্যঙ্গ করেছেন। সংবাদ সংগ্রহের বিষয় সম্পর্কে আসলে তারা জানেন না কিছুই। অনেকেই এখনো জানেন, জেলা উপজেলা কিংবা প্রত্যন্ত এলাকার সাংবাদিকদের কোনো বেতন দিতে হয় না। একটা কার্ড দিলেই তারা চলতে পারে। কিন্তু সময় বদলেছে…।

অনেক প্রতিষ্ঠান গাঁটের পয়সা খরচ করে ওই খায়েশ পূরণের পোর্টাল চালিয়ে যাচ্ছে দীর্ঘদিন, ভবিষ্যতে ‘ভালো’ করার আশায়। কারণ তাদের উপলব্ধি- আগামী দিনের গুরুত্বপূর্ণ গণমাধ্যমই হবে অনলাইন গণমাধ্যম।

অনলাইন সাংবাদিকতার শিক্ষার্থী ও কর্মী হিসেবে যেটুকু অভিজ্ঞতা হয়েছে তাতে বলতে পারি, অনলাইন নিউজ পোর্টালের সব পাঠকই যে অভিযোগ তোলেন তা কিন্তু নয় বরং অভিযোগকারীর সংখ্যা খুব একটা বেশিও নয়। যারা অভিযোগ করেন, তাদের একদল না বুঝেই তা করেন, অরেকদল বুঝে শুনেই করেন। এই ‘না বুঝে’ আর ‘বুঝে শুনে’ সমালোচনার বিষয়টি অনেক বড় বিষয়। কারণ ‘বুঝে শুনে’ সমালোচনার জন্য প্রথমেই বাংলাদেশে পেশাদার অনলাইন নিউজ পোর্টাল সম্পর্কে ধারণা থাকতে হবে। আগেই বলেছি, দেশে অনলাইন নিউজ পোর্টালের সংখ্যা প্রায় পাঁচ হাজার। তাহলে এটা মনে করা কি ঠিক হবে যে সব পোর্টালই বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশন করবে! দেশে কাগজের দৈনিক পত্রিকার সংখ্যাও হাজার তিনেকের কম নয়। শুধু রাজধানীতেই বোধহয় শ তিনেক দৈনিক কাগজ বের হয়। এর সব সংবাদ কি পাঠযোগ্য? অবশ্যই না। কাগজের পত্রিকার বিরুদ্ধে পাঠক কি ঢালাওভাবে অভিযোগ তোলেন? তোলেন না। তাহলে অনলাইন নিউজ পোর্টালের ক্ষেত্রে কেন তোলা হয়?

এখানে একটি কারণ স্পষ্ট আর তা হলো ১০-১৫ বা ২০টা কাগজ কিনে পড়ে সংবাদের মান যাচাই করা কোনো পাঠকেরই সম্ভব নয়। পাঠক ইচ্ছেমতো নিজের পছন্দের কাগজ বেছে নেন। তাছাড়া একজন পাঠক যে কাগজটি পড়েন, তিনি সারা বছর ওই কাগজের মধ্যেই থাকেন।

কদাচিৎ অন্য কাগজ হয়তো পড়েন। অনেক পাঠক অবশ্য একাধিক কাগজ পড়েন। কিন্তু অনলাইন নিউজ পোর্টালের ক্ষেত্রে যেটা হয় তাহলো, ইচ্ছে হলেই কয়েক মিনিটের মধ্যে পোর্টাল থেকে পোর্টালে ঘুরে একটা নিউজ যাচাই করে নেয়া যায় আর ফেসবুকে লাইক দেয়া থাকলে সব পোর্টালের নিউজ না চাইলেও সামনে চলে আসে আর তাতেই একশ্রেণির পাঠক বুঝে যান কারা বস্তুনিষ্ঠ, কারা একপেশে আর কারা অপেশাদার।

কিন্তু অখ্যাত কোনো পোর্টালের উস্কানিমূলক বা অনৈতিক কোনো সংবাদ পড়ে যারা অনলাইন সাংবাদিকতার চৌদ্দগোষ্ঠী উদ্ধার করেন, তারাই না বোঝার দলে। কারণ তারা নির্দিষ্ট পোর্টালের নামে অভিযোগ না করে অনলাইন গণমাধ্যমের ওপর দোষ চাপান।

সমালোচনা করার আগে পাঠককে অবশ্যই জানতে হবে- খায়েশ আর পেশাদারিত্ব এক জিনিস নয়। অন্যান্য গণমাধ্যমের মতোই অনলাইন গণমাধ্যমেও বিষয়গুলো আছে। কেন আছে সে বিষয়টিও অনেক পাঠক জানেন। বলা হয়ে থাকে- রাষ্ট্র যদি গণমাধ্যমের টুঁটি চেপে ধরে তাহলে যেমন গণমাধ্যম নষ্ট হয়ে যায়, ঠিক তেমনি রাষ্ট্র যখন যারে তারে গণমাধ্যমের মালিক হওয়ার ঢালাও সুযোগ দেয়, তখনো গণমাধ্যম নষ্ট হয়ে যায়। নিম্ন রুচির লোকজনও গণমাধ্যমের মালিক বনে যায়। তারা বাজারে দুর্গন্ধ সৃষ্টি করে আর সেই দুর্গন্ধের দায় বইতে হয় ভালো প্রতিষ্ঠানগুলোকেও।

টিভি স্টেশন করার জন্য সরকারের অনুমতি লাগে। যদিও রাজনৈতিক বিবেচনায় তা দেয়া হয়, তারপরও একটা অনুমতির দরকার হয়। পত্রিকা করতে গেলেও রেজিস্ট্রেশন করতে হয়। কিন্তু ‘তুঘলকি’ একটি বিষয় হলো-বাংলাদেশে যে কেউ ইচ্ছে করলেই একটি অনলাইন নিউজ পোর্টালের মালিক বা সম্পাদক হয়ে যেতে পারেন। এ জন্য কোনো অনুমতিরও প্রয়োজন পড়ে না আর পোর্টালগুলো কী প্রকাশ করবে না করবে তার কোনো জবাবদিহিতার ব্যাপারও নেই। এর ফলে ৯৯.৯ ভাগের অরুচি, অপসাংবাদিকতা, অশ্লীলতা বা উস্কানির দায় বহন করতে হচ্ছে ০.১ ভাগ নিউজ পোর্টালকে। কারণ ওই গরিষ্ঠসংখ্যার অনলাইনগুলোকে মানুষ চেনে না। চেনে লঘিষ্ঠসংখ্যার পোর্টালগুলোকেই।

কিন্তু অভিযোগের বেলায় ওই ‘বেয়াদব’ ‘চোর’ ‘দালাল’ পোর্টালগুলো নাম না নিয়ে অনলাইন গণমাধ্যমের শ্রাদ্ধ করা হয়। দেশে-বিদেশে বেশ কয়েক ধরনের বাংলা অনলাইন নিউজ পোর্টাল আছে। মোটা দাগে বলা যায়- ১. মূল ধারার অনলাইন নিউজ পোর্টাল ২. খায়েশ পূরণের নিউজ পোর্টাল। এই খায়েশ পূরণের নিউজ পোর্টালগুলোর কারণেই অনলাইন গণমাধ্যমের গায়ে দুর্নাম লেগে গেছে আঁতুড়ঘরেই।আবার খায়েশ পূরণের পাঁচ ধরনের পোর্টালের নাম বলা যেতে পারে। ১. ব্যক্তি প্রতিষ্ঠান বা গোষ্ঠীর মতাদর্শ প্রকাশের পোর্টাল ২. শখের পোর্টাল ৩. প্রোপাগান্ডা ছড়ানোর পোর্টাল ৪. ধান্দাবাজির পোর্টাল ও ৫. প্রেস্টিজ প্রদর্শনের পোর্টাল।

এসব নিউজ পোর্টালের সংবাদ পড়েই পাঠক বিভ্রান্ত হন। বিরক্ত হন আর ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া হিসেবে পুরো অনলাইন গণমাধ্যমের সমালোচনা করে। পাঠকের জানা দরকার তা হলো- ডেমেইনের দাম খুবই কম হওয়ায় যে কেউ একটি ছোট আকারের অনলাইন পোর্টাল তৈরি করে নিতে পারেন। বছরে একাকালীন একটা অর্থ পরিশোধ করতে হয়, তাও খুব সামান্য। তাই অনলাইন নিউজ পোর্টালের প্রকাশক-সম্পাদক বনে গিয়ে নিজেকে জাহির করার একটা প্রবণতা অনেকের মধ্যেই আছে। তিনি বন্ধুমহলে বলতে পারেন, আমার একটি পোর্টাল আছে দেইখো… আমি ওইটার সম্পাদক এবং প্রকাশক। খোঁজ নিলে দেখা যাবে ওনার কোনো সংবাদ কর্মী নাই। একটি পেশাদার পোর্টাল চালাতে যে ইন্টারনেট বিল আসে, মাসে সেই টাকা খরচ করারও সাধ্য ওনার নাই। অবসরে উনি সংবাদ চুরি করে নিজের পোর্টালে আপলোড করেন অথবা একটু টাকাওয়ালা হলে দু’চারজন ছেলেকে রেখে নিউজ চুরি করে কীভাবে আপলোড করতে হয় তা শিখিয়ে দেন আর তা চলতে থাকে অনলাইন গণমাধ্যমের তকমা নিয়ে। হিট বাড়ানোর জন্য এসব অনলাইনেই আপ করা হয় বিতর্কিত সংবাদ, কুরুচিপূর্ণ ছবি।

ব্যক্তি প্রতিষ্ঠান বা গোষ্ঠীর মতাদর্শ প্রকাশের অনলাইন পোর্টালগুলোতে নিরপেক্ষতা বজায় রাখার কোনো প্রশ্নই আসে না। এগুলোও চলে অন্যের সংবাদ চুরি করে। যে সংবাদ তাদের মতাদর্শের সঙ্গে যায়, তারা শুধু সেসব সংবাদই প্রকাশ করে। অনেক সময় তারা একটি সংবাদকে ঘুরিয়ে দিয়ে নিজেদের মতো করে প্রকাশ করে থাকে। এতেই সাধারণ পাঠক বিভ্রান্তিতে পড়ে।

শখের নিউজ পোর্টালের মধ্যে নিজেকে জাহির করার একটা ব্যাপার আছে। এগুলোর কোনো অফিস বা সংবাদকর্মী নেই। একজন ব্যক্তি অথবা কয়েক বন্ধু মিলে এসব নিউজ পোর্টাল চালায়। হাতে সময় পেলেই তারা কিছু সংবাদ আপ করে থাকেন সাইটটি আপডেট রাখতে।

কিছু পোর্টাল আছে যেগুলো রাজনৈতিক প্রোপাগান্ডা ছড়ানোর কাজ করে সব সময়। এগুলোর মধ্যে দু’চারটির অফিস থাকলেও দু’চারজন কর্মী অন্যের সংবাদ চুরি করে পোর্টাল সচল রাখেন। অনেক পোর্টালের নিচে অফিসের ঠিকানা থাকলেও ওই ঠিকানায় আসলে কোনো অফিসই নেই, এমন প্রমাণ শত শত আছে আর ধান্দাবাজির নিউজ পোর্টালের কথা বলতে গেলে শুরুতেই বলতে হবে, এগুলোর বেশিরভাগের মালিক তথ্য-প্রযুক্তি জগতের লোক। তারা বিভিন্নভাবে এসব পোর্টাল থেকে ইনকামের পথ খোঁজেন। ইনকামের জন্য পাঠক বাড়ানো দরকার আর পাঠক বাড়াতে তারা হেন কোনো কাজ নেই যা করেন না। অনেক বানোয়াট, অসত্য ও আমাদের সামাজিক প্রেক্ষাপটে যা অনৈতিক তাও এরা প্রকাশ করে থাকে।

অনেকে আবার ব্যক্তিগত প্রভাব আর নিজের ‘দাম’ বাড়ানোর জন্য পোর্টালের মালিক-সম্পাদক হয়ে গেছেন আর ওই প্রভাব খাটিয়ে তারা অনৈতিক কাজের মাধ্যমে নিজে লাভবান হওয়ার চেষ্টাও তাদের আছে। এদেরও একমাত্র পুঁজি চৌর্যবৃত্তি।

অল্প-বিস্তর টাকাওয়ালা কিছু মানুষও শুধু প্রেস্টিজ প্রদর্শনের জন্য অনলাইন পোর্টাল খুলে বসেছেন। তারা আসলে জানেনও না, কেবল পোর্টাল খুলে বসলেই হয় না, এর জন্য সংবাদকর্মী লাগে, তাদের বেতন দিতে হয়, আধুনিক সাংবাদিকতা জানতে হয়, একটা অফিস লাগে…।

খায়েশ পূরণের পোর্টালগুলো সম্পর্কে এই মুহূর্তে কারো কিছু করার নেই। সংবাদ চুরির বিষয়ে কারো কাছে অভিযোগ জানানোরও কোনো যুৎসই জায়গা বা উপায় নেই। তাই একটি অনলাইন নিউজ পোর্টাল খুলে বসার আগে কিছু শর্ত মানার বাধ্য বাধকতা জরুরি। তাহলেই কেবল খায়েশ পূরণের পোর্টালগুলো তলিয়ে যাবে অস্তর্জালের গহ্বরে। আবর্জনামুক্ত হবে আমাদের অনলাইন সাংবাদিকতা।

বাংলাদেশে আনলাইন সাংবাদিকতার শুরুটা ২০০৫ সালে হলেও ইন্টারনেটের সহজলভ্যতা না থাকায় ২০০৯-১০ সাল পর্যন্ত এ মাধ্যমের পাঠক ছিল হাতে গোনা। এরপর মানুষের হাতের নাগালে সহজে ইন্টারনেট আসতে থাকে। ফলে এ মাধ্যমের পাঠকও বাড়তে থাকে আর এ সময়ে কাগজের পত্রিকার চেয়ে অনলাইনের পাঠকই বেশি।

দেশে স্মার্টফোন ব্যবহারকারীর সংখ্যা যেমন বেড়েছে, তেমনি বেড়েছে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা আর যারা ইন্টারনেট ব্যবহার করেন তাদের সবাই ফেসবুক ব্যবহার করেন, আর যারা ফেসবুক ব্যবহার করেন তারা সবাই কোনো না কোনোভাবে অনলাইন নিউজ পোর্টালের পাঠক। কারণ ফেসবুক খুললেই কোনো না কোনোভাবে একাধিক নিউজ পোর্টালের লিংক এসে হাজির হয়।

তথ্য-প্রযুক্তির এ যুগে যতই সময় গড়িয়ে যাচ্ছে, মানুষ ততই সহজ উপায়ে তথ্য পাওয়ার চেষ্টা করছে। মানুষের সে চেষ্টার সঙ্গে চলতেই আসলে অনলাইন সাংবাদিকতার শুরু। পৃথিবীর অনেক দেশের মানুষ কাগজের পত্রিকা কেনা কমিয়ে দিয়েছে। এরইমধ্যে কয়েকটি দেশে কয়েকটি কাগজের দৈনিক বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। এমনকি মানুষ টিভি দেখাও কমিয়েছে। গত বছর বিবিসি ১০ হাজারের মতো কর্মী ছাঁটাই করেছে। কারণ মানুষ এখন আর আগের মতো টিভি দেখছে না বাসার ক্যাবল লাইন কেটে দিচ্ছে, ফলে বিবিসির আয় কমেছে।

এমন অবস্থায় অনলাইন গণমাধ্যমকেই ভবিষ্যতের নির্ভরশীল গণমাধ্যম হিসেবে দেখা হচ্ছে। পাঠক সচেতন হচ্ছে। একটা সময় আসবে, যখন অনলাইনের বাইরে আর কোনো কিছুরই প্রয়োজন বোধ করবে না কেউ।

আমাদের দেশে জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকদের অনেকেই এখনো অনলাইন সাংবাদিকতাকে সহজভাবে মেনে নিতে পারেননি। খায়েশ মেটানোর পোর্টালগুলোর সংবাদের মান আর বস্তুনিষ্ঠতার বিষয়ে তারা সন্তুষ্ট হতে না পেরে হয়তো অনলাইন নিউজপোর্টাল নিয়ে অবজ্ঞার সুরে কথা বলেন এখনো। আমি মনে করি, তারা না বোঝার দলে। এ গণমাধ্যমের কর্মীদের এখনো যথেষ্ট মূল্যায়ন করেন না সরকারের অনেক মন্ত্রী-আমলা। টিভি সাংবাদিকরা মাইক এগিয়ে ধরলেই তারা কথা বলে ওঠেন, কিন্তু অনলাইন নিউজ পোর্টালের সাংবাদিকদের কাছ থেকে তারা দূরে থাকার চেষ্টা করেন। তবে তাদের ভুল ধারণা ভাঙা শুরু হয়েছে। অনেক কর্তামশায়ই এখন পেশাদার পোর্টালগুলোতে এসএমএস পাঠিয়ে নিজের সংবাদের বিষয়ে জানতে চান। সংবাদ প্রকাশের অনুরোধ করেন।

বিজ্ঞাপনদাতারাও বিজ্ঞাপন প্রচারের ক্ষেত্র হিসেবে অনলাইন নিউজ পোর্টালগুলোকে গৌন অবস্থায় রেখেছে। ফলে পেশাদার পোর্টালের বৈশিষ্ট্য পাওয়ার জন্য যে পরিমাণ অর্থনৈতিক সচ্ছলতা অর্জন করা প্রয়োজন অনেক পোর্টালই তা না পেরে অফ লাইনে চলে যেতে বাধ্য হয়েছে।

এ রকম চতুর্মখী সমস্যার মধ্যেও নতুন দিনের নতুন গণমাধ্যম আলোর পথে ছুটছে। খায়েশ পূরণের আবর্জনাগুলো পথে বাধার সৃষ্টি করছে বলে এ পথে একটুখানি বেশি পরিচর্যার দরকার। এর অংশ হিসেবে পূর্ণ সেটআপ ছাড়া নিউজ পোর্টালের অনুমতি না দেয়ার আইনও হওয়া দরকার। তাহলে আর ব্যাঙের ছাতার মতো পোর্টাল গজাবে না। মানুষের মধ্যে ছড়াবে না অবিশ্বাস, অস্বস্তি কিংবা আশঙ্কার বিষাক্ত বাতাস। হয়তো সেদিন আর বেশি দূরে নয়, যেদিন সংবাদের জন্য মানুষ অনলাইনকেই প্রাধান্য দেবে। বুঝে নেবে পেশাদারিত্ব আর খায়েশ পূরণের নিউজ পোর্টাল কাকে বলে। মানবকণ্ঠ

মন্তব্য

আপনার ইমেইল গোপন থাকবে - আপনার নাম এবং ইমেইল দিয়ে মন্তব্য করুন, মন্তব্যের জন্য ওয়েবসাইট আবশ্যক নয়

*

Open

Close