Home » শীর্ষ সংবাদ » কেন আলোচনায় বিচারপতি খায়রুল হক?

কেন আলোচনায় বিচারপতি খায়রুল হক?

সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিল পূর্ণাঙ্গ রায়ের আপিল বিভাগের পর্যবেক্ষণ নিয়ে সারাদেশে যখন তোলপাড়; তখন হঠাৎ করে বিতর্কে চলে আসে সাবেক প্রধান বিচারপতি বর্তমানে আইন কমিশনের চেয়ারম্যান বিচারপতি এবিএম খায়রুল হকের নাম। বিচার বিভাগ সম্পর্কে তাঁর (খায়রুল হক) বক্তব্য নিয়ে আওয়ামী লীগ ও বিএনপিপন্থী আইনজীবীরা পাল্টাপাল্টি সংবাদ সম্মেলন করেছেন। আইন কমিশনের চেয়ারম্যান পদ থেকে অপসারণ এবং আদালত অবমাননার দায়ে তার বিচারের দাবিতে তিন দিনের কর্মসূচি দেয়া হয়েছে। ষোড়শ সংশোধনী বাতিল রায়ের পর্যবেক্ষণ নিয়ে দেশের সংবিধান বিশেষজ্ঞ, আইনজীবীদের পাশাপাশি আওয়ামী লীগ-বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল রায়ের পক্ষে-বিপক্ষে বক্তব্যের তুফান তুলছেন। মন্ত্রী ও ক্ষমতাসীন দলের কিছু নেতা রায়ের ‘পর্যবেক্ষণ’ নিয়ে কথাবার্তা বললেও সংবিধান বিশেষজ্ঞ, আইনজীবী, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি ও বিএনপির নেতারা আইন কমিশনের চেয়ারম্যান বিচারপতি খায়রুল হকের দলবাজী ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন। টিভির টকশোগুলোয় সাবেক প্রধান বিচারপতিকে তুলোধূনো করা হচ্ছে।
মূলত সরকারের লাভজনক প্রতিষ্ঠানে কর্মরত থাকাবস্থায় হঠাৎ করে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে সর্বোচ্চ আদালতের রায়ের পর্যবেক্ষণ নিয়ে বিতর্কিত বক্তব্য দেন বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক। দেশে বিরাজমান বিভিন্ন ইস্যু ছাপিয়ে যখন রায় নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা, বিতর্ক ও পাল্টা বিতর্কে; তখন সব বিতর্ক ছাপিয়ে সামনে চলে আসে খায়রুল হকের বিতর্কিত বক্তব্য। ‘গণপ্রজান্ত্রের বদলে দেশ এখন বিচারিক প্রজাতন্ত্রে যাচ্ছে’ মক্তব্য যেন বিতর্কের আগুনে ঘি ঢেলে দেয়। সাবেক প্রধান বিচারপতি হিসেবে তার বক্তব্য ‘আদালত অবমাননার নামান্তর’ অভিযোগ তুলে তাকে গ্রেফতার এবং আইন কমিশনের চেয়ারম্যান পদ থেকে অপসারণের দাবিকে আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে আইনজীবীদের একটি সংগঠন। বিএনপিপন্থী আইনজীবীদের সংগঠন ‘জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরাম’ নামের ওই সংগঠন আগামী রবি, বুধ ও বৃহস্পতিবার সারাদেশের আদালত প্রাঙ্গণে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করবে।

ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায়ে আপিল বিভাগের পর্যবেক্ষণে ‘অপ্রাসঙ্গিক বিষয় আনা হয়েছে’ অভিযোগ করলেও সাবেক প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক ‘মুন সিনেমা হল’ সংক্রান্ত মামলায় তত্ত¡াবধায়ক ইস্যুসহ অসংখ্য অপ্রাসঙ্গিক বিষয়ে পর্যবেক্ষণ দেন। যার পরিণতিতে দেশের রাজনীতির চিত্র পাল্টে যায়। বিশিষ্টজনদের অভিযোগ সাবেক প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক পরবর্তীতে কিছু সুবিধার পেতে নিজের দেয়া রায় নিজেই মানেননি। বহুল আলোচিত তত্ত¡াবধায়ক সরকার ব্যবস্থা তথা ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিলের রায়ে যে যুক্তিতে বিচারপতিদের প্রধান উপদেষ্টা পদে না রাখতে অভিমত দেন; সে যুক্তি নিজেই ভেঙ্গে ফেলেন। ‘বিচার বিভাগের স্বাধীনতা রক্ষার স্বার্থে’ এ জাতীয় পদে বিচারপতিদের সম্পৃক্ত করা বাঞ্ছনীয় নয় অভিমত দিয়ে নিজেই যোগ দেন ‘লাভজনক পদ’ আইন কমিশনের চেয়ারম্যান পদে। প্রবীণ সাংবাদিক মাহবুব উল্লাহ টিভির এক টকশোতে বলেছেন, তত্ত¡াবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলসহ অনেক বিতর্কিত রায়ের জের ধরে পুরস্কার হিসেবে সরকার তাকে আইন কমিশনের চেয়ারম্যান পদে নিয়োগ দিয়েছে। তাকে নিয়োগ দেয়ার জন্য সরকার আড়াই বছর আইন কমিশনের চেয়ারম্যান পদ ফাঁকা রাখেন।
উল্লেখ, বিচারপতি আবদুর রশীদ আইন কমিশনের চেয়ারম্যান পদ থেকে অবসরে যাওয়ার পর এর সদস্য ড. শাহ আলমকে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান করা হয়। দেশের ১৯তম প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক ২০১১ সালের ১৭ মে অবসরে যান। আর ২০১৩ সালের ২৩ জুন কমিশন আইনের ১৯৯৬-এর ৫ (৩) ধারার ক্ষমতাবলে সরকার তাঁকে আইন কমিশনের চেয়ারম্যান পদে নিয়োগ দেন। সাংবাদিক মাহফুজউল্লাহ’র ভাষায় বড় পদ থেকে ছোট পদে চাকরি করা মানহানিকরও বটে। সাংবাদিক গোলাম মুর্তোজা সাবেক প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়রুল হকের বিভিন্ন রায়ের প্রসঙ্গ তুলে ধরে ষোড়শ সংশোধনী বাতিল রায়ের পর্যবেক্ষণ নিয়ে সমালোচনার আগে আয়নায় নিজের চেহারা দেখার পরামর্শ দেন।
সাবেক প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক তত্ত¡াবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে দেয়া রায়ে উল্লেখ করেন, ‘সংবিধান (ত্রয়োদশ সংশোধন) আইন, ১৯৯৬, অবৈধ হওয়া সত্তে¡ও আগামী দশম ও একাদশ সর্বোচ্চ এই দুইটি সাধারণ নির্বাচন জাতীয় সংসদের বিবেচনা অনুসারে তত্ত¡াবধায়ক সরকার ব্যবস্থার অধীনে হতে পারে। তবে (১) জাতীয় সংসদ তত্ত¡াবধায়ক সরকার ব্যবস্থায় বাংলাদেশের অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি-আপীল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিগণকে বাদ দেয়ার জন্য আইন প্রণয়ন করতে পারে। কারণ বিচার বিভাগের স্বাধীনতা রক্ষার স্বার্থে তাদেরকে সম্পৃক্ত করা বাঞ্ছনীয় নয়। (২) তত্ত¡াবধায়ক সরকার শুধুমাত্র জনগণের নির্বাচিত জাতীয় সংসদ সদস্যগণ দ্বারা গঠিত হইতে পারে।’ অথচ তিনি আইন কমিশনের চেয়ারম্যানের লাভজনক পদে নিজেই যোগ দেন।
প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা দৃঢ়ভাবে বলেছেন, রায় নিয়ে তিনি কারো রাজনীতির ফাঁদে পা দেবেন না। রায় নিয়ে রাজনীতি না করার আহŸান জানিয়েছেন। সরকারের পক্ষ থেকে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক যে সংবাদ সম্মেলন করেছেন ষেখানেও তিনি বিচার বিভাগের প্রতি পূর্ণ সম্মান দেখিয়ে বক্তব্য দিয়েছেন। কিন্তু বিচার বিভাগ নিয়ে সাবেক প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়রুল হকের আক্রমণাত্মক বক্তব্যে অনেকেই বিস্ময় প্রকাশ করেন। কেউ কেউ বলেছেন, অতীতে সাবেক কোনো প্রধান বিচারপতি এভাবে কোনো রায় নিয়ে সমালোচনা করেছেন বা উচ্চ আদালত নিয়ে আক্রমণাত্মক কথাবার্তা বলেছেন এমন তথ্য জানা নেই। সরকারি লাভজনক পদে থেকে জনগণের ট্রাক্সের অর্থে সরকারের বেতন ভোগ করে সাবেক প্রধান বিচারপতি সংবাদ সম্মেলন করে রায়ের সমালোচনা করতে পারেন কি না; তিনি যে পদে আছেন সে পদের দায়িত্বের মধ্যে এটি পড়ে কি না এসব নিয়ে বিতর্ক হচ্ছে।
এ বি এম খায়রুল হক ষোড়শ সংশোধনী বাতিল রায়ের সমালোচনা করে বলেছেন, এতে অতি মাত্রায় অপ্রাসঙ্গিক কথা বলা হয়েছে যার কোনো প্রয়োজন ছিল না। এ রায় পূর্বপরিকল্পিত। তার এ বক্তব্য প্রসঙ্গে আইনজীবীদের অনেকে টেনে এনেছেন মুন সিনেমা হলের রায় দিতে গিয়ে তিনি কিভাবে সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনী বাতিল করে দিয়েছিলেন সে বিষয়টি। আইন কমিশনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ প্রসঙ্গে সাংবাদিকরা খায়রুল হককে প্রশ্ন করলে তিনি প্রসঙ্গ এড়িয়ে গিয়ে বলেন, অতীতের কথা নয় আমি বর্তমানের কথা বলার জন্য হাজির হয়েছি।
বিএনপিপন্থী আইনীজীরা তো বটেই অনেক বিশিষ্ট আইনজীবীও বলতে শুরু করেছেন এ বি এম খায়রুল হকের সর্বশেষ বক্তব্যের মাধ্যমে পরিষ্কার হয়েছে অতীতে তার দেয়া বিভিন্ন রায়ের পেছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য থাকতে পারে। ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায় নিয়ে তার বক্তব্য প্রসঙ্গে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলছেন, সাবেক প্রধান বিচারতি খায়রুল হক কোনো একটি মহলের হয়ে কথা বলছেন এবং তার বক্তব্য রাজনৈতিক। এ ছাড়া গত কয়েক দিনে বিভিন্ন টকশোতে প্রায় অর্ধশত আলোচক তীব্র ভাষায় তাঁর সমালোচনা করে বলেছেন এ বি এম খায়রুল হক সর্বশেষ বক্তব্যের মাধ্যমে নিজের মুখোশ খুলে ফেলেছেন। এক আলোচক আইন কমিশনের চেয়ারম্যান খায়রুল হককে সুবিধাবাদী হিসেবে অবিহিত করে বলেছেন, দেশে দীর্ঘকাল ধরে চলা রাজনৈতিক সঙ্কট ও অনাকাক্সিক্ষত পরিস্থিতির মূলে তত্ত¡াবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল। সংক্ষিপ্ত প্রাথমিক রায়ে ‘অন্তত আরো দুইবার তত্ত¡াবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন করা যেতে পারে’ বলে বলা হলেও অবসরে যাওয়ার ১৬ মাস পরে লিখিত পূর্ণাঙ্গ রায়ে তিনি সে বিষয়টি তুলে দিয়ে গুরুত্বর অন্যায় করেন।
এখন বিতর্কের নাম যেন হয়ে গেছে সাবেক প্রধান বিচারপতি খায়রুল হক। জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের কর্মসূচিই শুধু নয়; সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক, বøগ, টুইটারে আইন কমিশনের চেয়ারম্যান এবিএম খায়রুল হককে নিয়ে নানান ধরনের মন্তব্য বক্তব্য দেয়া হচ্ছে। সেখানে শেয়ার, লাইক, মন্তব্য করা হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোম মাধ্যমে অনেকেই খায়রুল হকের রাজনৈতিক পরিচিত তুলে ধরছেন; ক্ষমতাসীন দলের ঋণ পরিশোধের দায়ের কথা বলছেন; আবার কেউ কেউ এমন সব মন্তব্য করছেন যা পত্রিকায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। বিচার বিভাগ নিয়ে সাবেক এই প্রধান বিচারপতির বক্তব্য নিয়ে সংবিধান বিশেষজ্ঞ ব্যারিস্টার শাহদিন মালিক বলেছেন, সাবেক প্রধান বিচারপতি হয়ে তিনি যা বলেছেন তাতে অহেতুক বিতর্ক উসকে দেয়া হয়েছে। অতীতে কোনো সাবেক প্রধান বিচারপতি এভাবে কোনো রায় নিয়ে সমালোচনা করেছেন বলে আমার মনে পড়ে না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক ড. আসিফ নজরুল ফেসবুক স্ট্যাটাসে লিখেছেন, বিচারপতি খায়রুল হক আবার মুখ খুলেছেন। একজন সাবেক প্রধান বিচারপতি হয়ে তিনি বর্তমান প্রধান বিচারপতিকে কটাক্ষ-তীব্র সমালোচনা করেছেন। তার অভিযোগ বর্তমান প্রধান বিচারপতি ষোড়শ সংশোধনী মামলায় অপ্রাসঙ্গিক বক্তব্য দিয়েছেন। অথচ তিনি নিজে তার বিভিন্ন রায়ে বহু অপ্রাসঙ্গিক মন্তব্য করেছেন, বহু রাজনৈতিক বিষয়ে অযাচিত বক্তব্য দিয়েছেন।
সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন বলেছেন, তত্ত¡াবধায়ক সরকার নিয়ে খায়রুল হকের দেয়া ত্রয়োদশ সংশোধনী রায়ের মাধ্যমে দেশে রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি এবং দেশের মানুষ ভোটের অধিকার হারিয়েছে। তাই তিনি ষোড়শ সংশোধীর রায় বাতিলে পূর্বপরিকল্পনার গন্ধ পাচ্ছেন। বিচার ব্যবস্থা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার বিরুদ্ধে অবস্থান স্পষ্ট করে প্রমাণ করলেন তিনি কি ছিলেন। মানুষ কি ধরে নেবে খায়রুল হকের দেয়া ত্রয়োদশ সংশোধনীর রায় পূর্ব ধারণাপ্রসূত ছিল? ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ বলেছেন, সাবেক প্রধান বিচারপতি সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল তথা দেশের সর্বোচ্চ আদালতের বিচারপতিদের সম্পর্কে যেসব কথা বলেছেন তা ভয়ানকভাবে আদালত অবমাননার শামিল। তিনি দাবি করেছেন এ রায় পূর্ব-পরিকল্পিত, পূর্ব-ধারণাপ্রসূত। রায় এবং শুনানি সবই নাকি আগে থেকে ঠিক করা ছিল। তা ছাড়া সর্বোচ্চ আদালতের বিচারপতিদেরও তিনি অপরিপক্ব হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। এটা স্পষ্ট আদালত অবমাননার শামিল।
সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায় নিয়ে আলোচনা যেমন থামছে না; বরং নিত্য নতুন নতুন মাত্রা যোগ হচ্ছে; তেমনি আইন কমিশনের চেয়ারম্যান বিচারপতি এবিএম খায়রুল হকের বক্তব্য নিয়ে বিতর্ক ও পাল্টা বিতর্ক যেন থামছেই না। ‘হৃদয় খুড়ের বেদনা জাগানো’ প্রবাদের মতোই প্রধান বিচারপতি হিসেবে অতীতে তাঁর দেয়া অতীতের রায়গুলো নিয়ে নতুন করে বিতর্ক হচ্ছে।
উৎসঃ ইনকিলাব

মন্তব্য

আপনার ইমেইল গোপন থাকবে - আপনার নাম এবং ইমেইল দিয়ে মন্তব্য করুন, মন্তব্যের জন্য ওয়েবসাইট আবশ্যক নয়

*

Open

Close