ব্রেকিং:
Home » আন্তর্জাতিক » ঘিরে ফেলেছে সেনাবাহিনী

ঘিরে ফেলেছে সেনাবাহিনী

আরাকানে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর নির্মমতা থেমে নেই। প্রতিদিনই রোহিঙ্গাদের ঘরবাড়ি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন স্থাপনায় তারা অগ্নিসংযোগ করছে। আরাকানে একজন রোহিঙ্গা মুসলিমকেও থাকতে দেয়া হবে না- এমন কঠোর মনোভাব নিয়ে উচ্ছেদ অভিযান ও গণবিতাড়ন অভিযান অব্যাহত রেখেছে সেনাবাহিনী। বাড়িঘর থেকে বিতাড়িত হয়ে সীমান্তের ওপারে নাফ নদীর তীরে, বনে-জঙ্গলে অবস্থান নিয়ে হাজার হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশের অপেক্ষায় প্রহর গুণছেন। চার দিন ধরে নাফ নদীর তীরে আটকে আছেন বুচিডংয়ের হাজারো রোহিঙ্গা। তারা খেয়ে-না-খেয়ে, রোদে পুড়ে খোলা আকাশের নিচে অপেক্ষা করছেন বাংলাদেশে আসার জন্য। এ অবস্থায় গত শুক্রবার রাতে প্রচণ্ড ঝড়ো হওয়া ও প্রবল বৃষ্টিতে ভিজে ১০টি শিশু মারা গেছে।

সূত্র জানিয়েছে, বৃষ্টিতে ভিজে ৪০-৫০টি শিশু গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েছে। এর মধ্যে ১০-১২টি শিশুর অবস্থা আশঙ্কাজনক। রাতে প্রবল বৃষ্টি হলে রোহিঙ্গারা পাহাড়ের ঢালুতে গাছের নিচে আশ্রয় নেয়ার জন্য নদীর তীর থেকে পাহাড়ের দিকে যেতে চাইলে মিয়ানমারের সেনারা তাদের আটকে দেয় এবং নদীর দিকে ধাওয়া করে। এসব আটকে পড়া রোহিঙ্গাদের মধ্যে একজন বৃদ্ধ কান্নাজড়িত কণ্ঠে জানান, কোলের শিশু কোলেই মারা পড়বে যদি তাদের দ্রুত চিকিৎসার ব্যবস্থা করা না হয়। এভাবে আর ক’দিন গেলে বৃদ্ধরাও মারা পড়বেন। তিনি আটকে পড়া এসব রোহিঙ্গাকে উদ্ধার ও শিশুদের মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচাতে সাহায্যের আকুতি জানিয়েছেন। এভাবে প্র্রতিদিনই বাংলাদেশে এসে প্রাণে বাঁচার আকুতি নিয়ে হাজার হাজার রোহিঙ্গা নাফ নদীর ওপারে জড়ো হচ্ছেন। তারা বাঁচার জন্য আকুতি জানাচ্ছেন এমন কয়েকটি ভিডিও এপারে তাদের আত্মীয়দের কাছে পাঠিয়েছেন।

নাফ নদী পার হওয়ার জন্য নৌকা না থাকায় তারা বাংলাদেশে আসতে পারছেন না। এসব রোহিঙ্গার সাথে থাকা খাদ্যও শেষ হয়ে গেছে। অভুক্ত শিশুরা কাদছে। ৮-১০ দিন ধরে তাদের চোখে ঘুম নেই। ক্লান্ত শরীর। চোখগুলো কোটরে ঢুকে গেছে। শিশু থেকে বৃদ্ধ সবারই একই অবস্থা। এসব রোহিঙ্গা জানান, তারা শেষ পর্যন্ত চেয়েছিলেন নিজ দেশে থেকে যেতে। অনেক দিন পালিয়েছিলেন আরাকানের পাহাড় ও ঝোপ-জঙ্গলে। রাত কাটাচ্ছেন অনাহারে-অর্ধাহারে।

এ দিকে শুক্রবার মধ্যরাতে বুচিডংয় টাউনশিপে রোহিঙ্গাদের অন্তত ৩০টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানে আগুন দিয়েছে সেনাবাহিনী। এ ছাড়া প্রাণহানির আশঙ্কায় আশপাশ থেকে পালিয়ে যাওয়া রোহিঙ্গাদের বাড়িতে প্রতিদিনই আগুন দেয়া হচ্ছে। শুক্রবার মধ্যরাতে সীমান্ত শহর মংডু পৌরসভার সুধা গ্রামে আগুন দেয় সেনাবাহিনী। টেকনাফ পৌর এলাকা থেকে ওই আগুনের শিখা দেখেছেন সীমান্তের অধিবাসীরা। বৃহস্পতিবার নয়াপাড়া, পূর্ব পাড়া, পশ্চিম পাড়া, সুন্দরী পাড়া ও মাঙ্গালা পাড়ায় আগুন দেয় সেনা সদস্যরা। এ সময় শতাধিক রাখাইন মুসলিমবিরোধী স্লোগান দিয়ে রোহিঙ্গাদের ধাওয়া করে। গোদাম পাড়া নামক স্থানে নাফ নদীর পাশে প্রায় ১০ হাজার রোহিঙ্গাকে ঘিরে ফেলেছে সেনাবাহিনী।

সেখানে কাপড় ও পলিথিন দিয়ে ছোট ছোট তাঁবু বানিয়ে তারা অবস্থান করছেন। সেনাবাহিনী তাদেরকে কোথাও যেতে দিচ্ছে না। তাদের কাছে থাকা মোবাইলও কেড়ে নিচ্ছে সেনারা। এসব রোহিঙ্গার খাদ্য ও পানির তীব্র সঙ্কট দেখা দিয়েছে। সেখানের এক রোহিঙ্গা শুক্রবার গোপনে তার আত্মীয়দের কাছে একটি ভিডিও পাঠিয়ে এ অবস্থার বর্ণনা দেন। এখন তাদেরকে নিয়ে সেনারা কী করবে তা নিয়ে তারা শঙ্কিত হয়ে পড়েছেন।

অন্য দিকে সীমান্তে স্থলমাইন পাতা, কাঁটাতারের বেড়া, বেড়ায় বিদ্যুৎ সংযোগের পর এবার সীমান্তের কাছে বাংকার খনন করছে মিয়ানমারের সেনারা। এক সপ্তাহ ধরে বাংকার খনন চলছে। সীমান্তের তমব্রু থেকে লেবুছড়ি এলাকার বিপরীতে মিয়ানমারের ঢেকুবুনিয়া থেকে আমতলা পর্যন্ত দীর্ঘ ৭০ কিলোমিটার এলাকায় দুই শতাধিক শ্রমিক বিভিন্ন দলে ভাগ হয়ে এ কাজ করছে। পাশাপাশি এসব শ্রমিকের নিরাপত্তার জন্য সীমান্তের জিরোপয়েন্টে অবস্থান নিয়েছে মিয়ানমারের সেনারা। তারা তিন ভাগে ভাগ হয়ে ভারী অস্ত্র কাঁধে নিয়ে টহল দিচ্ছে। এক সপ্তাহ ধরে সীমান্ত এলাকার বাংলাদেশীরা এ ঘটনা প্রত্যক্ষ করে শঙ্কিত হয়ে পড়ছেন।

ওপারের তমব্রু সীমান্তের রোহিঙ্গারা জানান, ঢেকুবুনিয়া, পুরান মাইজ্জা, লম্বাবিল, সিকদারপাড়াসহ তাদের এলাকার সীমান্তঘেঁষা বিভিন্ন গ্রামে গত মঙ্গলবার থেকে বাংকার খনন করছে মিয়ানমার সেনাবাহিনী। এর আগে তারা নো ম্যানস ল্যান্ডে কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে স্থলমাইন পুঁতে রেখেছে। গত কয়েক সপ্তাহে স্থলমাইন বিস্ফোরণে ১১ রোহিঙ্গা এবং শতাধিক প্রাণী মারা গেছে। সর্বশেষ মারা গেছেন মিয়ানমারের বলিবাজারের আবুল কাসিমের ছেলে নুরুচ্ছাফা (৩৪)। ৩ অক্টোবর সকাল ১০টায় সীমান্তের ৪৪ নম্বর পিলারের বিপরীতে মিয়ানমারে মাইন বিস্ফোরণে তিনি মারা যান।

গত শুক্রবার সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্টে নো ম্যানস ল্যান্ডে মিয়ানমারের হেলিকপ্টার দেখেছেন সীমান্তে অবস্থানকারী লোকজন। তারা এভাবে নিয়মিত টহল দেয়। মাঝে মধ্যে গুলি ছোড়ে। বাংলাদেশ থেকেও গুলির শব্দ শোনা যায়। তারা জানান, শুধু তমব্রু সীমান্ত নয়, বাংলাদেশের চাকমা পাড়া ও বাইশারী সীমান্ত এলাকায়ও অবস্থান নিয়েছে মিয়ানমার সেনাবাহিনী।

তবে বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষীদের চোখ ফাঁকি দিতে তারা দিনের বেশির ভাগ সময় ঘনজঙ্গলে অবস্থান করেন বলে জানান স্থানীয়রা। তমব্রু-চাকমা পাড়া ও বাইশারী এলাকার জিরোপয়েন্ট বা নো ম্যানস ল্যান্ডে অন্তত ১৫ হাজার রোহিঙ্গা অবস্থান করছেন।

নাইক্ষ্যংছড়ির ৩১ বিজিবির অধিনায়ক লে. কর্নেল আনোয়ারুল আজিম জানান, প্রতিটি দেশ যার যার নিরাপত্তার জন্য সব কিছু করবে। বাংকার খনন মানে এই নয় যে, তারা আমাদের সাথে যুদ্ধ করবে। তিনি জানান, মিয়ানমারের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক নষ্ট হয়নি। কোনো অস্বাভাবিক তৎপরতা পরিলক্ষিত হলে আলোচনার মাধ্যমে বাংলাদেশ সমাধান করবে। বর্তমানে সীমান্ত পরিস্থিতি স্বাভাবিক। সীমান্তে নিজেদের শক্তি বৃদ্ধির পাশাপাশি নজরদারি বাড়িয়েছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ-বিজিবি। লে. কর্নেল মঞ্জুরুল হাসান খান বলেন, আমরা একে হুমকি মনে করছি না। অন্য দিকে আমাদের যা যা করা প্রয়োজন তা করছি।

মন্তব্য

আপনার ইমেইল গোপন থাকবে - আপনার নাম এবং ইমেইল দিয়ে মন্তব্য করুন, মন্তব্যের জন্য ওয়েবসাইট আবশ্যক নয়

*

Open

Close