Home » বিশেষ সংবাদ » তত্ত্বাবধায়কের পক্ষে থাকাই কাল হলো ওয়াহহাব মিঞার!

তত্ত্বাবধায়কের পক্ষে থাকাই কাল হলো ওয়াহহাব মিঞার!

কয়েক মাস টানাপোড়েনের পর আবারো জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন করে আপিল বিভাগের দ্বিতীয় জ্যেষ্ঠ বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনকেই দেশের ২২তম প্রধান বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদ। এর মাধ্যমে জ্যেষ্ঠ হওয়া সত্ত্বেও তৃতীয় বারেরমতো প্রধান বিচারপতি হওয়া থেকে বাদ পড়েছেন বর্তমান ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি আব্দুল ওয়াহহাব মিঞা।

এদিকে জ্যেষ্ঠ হয়েও প্রধান বিচারপতি নিয়োগ না পাওয়ায় পদত্যাগ করেছেন বিচারপতি আব্দুল ওয়াহহাব মিঞা। যদিও রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠানো পদত্যাগপত্রে এই সিদ্ধান্ত গ্রহণে ‘ব্যক্তিগত কারণের’ কথা বলেছেন তিনি।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিচারপতি আব্দুল ওয়াহহাব মিঞা আইনজীবী থাকাকালীন আওয়ামীপন্থী আইনজীবী প্যানেল থেকে দুই বার সুপ্রিমকোর্ট বার সমিতির সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছিলেন। তিনি ওই সময় আওয়ামী লীগের কাছে আস্থাভাজন ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত ছিলেন। বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার পর হাইকোর্টে থাকাকালীন সময়েও তিনি আওয়ামী ঘরানার বিচারপতি হিসেবেই পরিচিত ছিলেন।

আপিল বিভাগে আসার পরই তিনি দলীয় লেবাস খুলে নিরপেক্ষ হওয়ার চেষ্টা করেন। বিভিন্ন মামলার রায়ে তিনি নিরপেক্ষতার প্রমাণও রেখেছেন। বিশেষ করে জামায়াত নেতাদের বিরুদ্ধে কথিত যুদ্ধাপরাধের মামলার রায়গুলোতে তিনি নজিরবিহীন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। কয়েকটি রায়ে আব্দুল ওয়াহহাব মিঞা অন্য বিচারপতিদের সঙ্গে দ্বিমত প্রকাশ করেছেন। এমনকি মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীকে তিনি খালাসও দিয়েছেন।

অ্যানালাইসিস বিডির অনুসন্ধানে জানা যায়, সাবেক প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়রুল হকের তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল সম্পর্কিত বিতর্কিত রায়েও দ্বিমত পোষন করেছিলেন বিচারপতি আব্দুল ওয়াহহাব মিঞা। ২০১১ সালের ১০ মে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিলের সেই রায়ে আপিল বিভাগের ছয় বিচারপতির মধ্যে তিনজন একমত পোষণ করেন।

একমত হওয়া তিনজন হলেন- তৎকালিন আপিল বিভাগের বিচারপতি মো. মোজাম্মেল হোসেন, বিচারপতি এস কে সিনহা ও বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন। অন্যদিকে রায়ে দ্বিমত পোষণ করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বহাল রাখার পক্ষে মত দেন বিচারপতি মো. আবদুল ওয়াহহাব মিঞা ও বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানা।

তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিলের পক্ষে থাকা ৩ জন বিচারপতিই পরবর্তিতে প্রধান বিচারপতি হয়েছেন। বিচারপতি মোজাম্মেল হোসেন জ্যেষ্ঠতা অনুযায়ী প্রধান বিচারপতি হলেও এস কে সিহাকে প্রধান বিচারপতি করা হয় জ্যেষ্ঠ বিচারপতি আব্দুল ওয়াহহাব মিঞাকে ডিঙিয়ে। নানা ঘটনা ও সরকারের চাপে পড়ে এস কে সিনহা পদত্যাগ করলে আব্দুল ওয়াহহাব মিঞার প্রধান বিচারপতি হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দেয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ফের তার জ্যেষ্ঠতা ডিঙিয়ে জুনিয়র বিচারপতি মাহমুদ হোসেনকে প্রধান বিচারপতি করা হলো।

জানা যায়, ওয়াহহাব মিঞা ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি হওয়ার পরই সরকারকে খুশী করতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। প্রথম দিনই তিনি রাশিয়ার প্রধান বিচারপতির সঙ্গে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার খুব প্রশংসা করেন। বিশিষ্টজনরা তখন ওয়াহহাব মিঞার নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। এগুলোকে প্রধান বিচারপতি হওয়ার প্রচেষ্টা হিসেবেই দেখেছেন তারা।

নিম্ন আদালতের বিচারকদের আচরণ ও শৃঙ্খবিধির গেজেট প্রকাশ নিয়ে সাবেক প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহার সঙ্গে সরকারের প্রচণ্ড দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয়েছিল। একাধিকবার সময় দেয়ার পরও সরকার গেজেট প্রকাশ করেনি। আর মাঝে একবার একটি খসড়া তৈরি করলেও সেটা মাসদার হোসেন মামলার রায়ের পর্যবেক্ষণের আলোকে হয়নি। সরকার ইচ্ছেমতো নিজেদের মতো করে একটি খসড়া তৈরি করে সেটি সুপ্রিমকোর্টে জমা দেয়। পরে সুপ্রিমকোর্ট এটাকে ফেরত পাঠায়। আইন মন্ত্রণালয়কে আপিল বিভাগের সঙ্গে বসতে বললেও আইন মন্ত্রণালয় সেটা করেনি।

কিন্তু দেখা গেছে, প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহার বিদায়ের পর এক সপ্তাহের মধ্যেই আইনমন্ত্রী আনিসুল হক ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি আব্দুল ওয়াহহাব মিঞার বাসভবনে গিয়ে গোপন মিটিং করে নিম্ন আদালতের বিচারকদের আচরণ ও শৃঙ্খলাবিধির গেজেট প্রকাশ করে। সরকার প্রণীত এই খসড়া মাসদার হোসেন মামলার রায়ের পর্যবেক্ষণের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হওয়া সত্ত্বেও বিচারপতি আব্দুল ওয়াহহাব মিঞা সেটাকে গ্রহণ করেছেন। এনিয়ে সংবিধান বিশেষজ্ঞ ও বিশিষ্ট আইনজীবীরা আপত্তি জানালেও আব্দুল ওয়াহহাব মিঞা এসবকে পাত্তাই দেননি।

ওই সময় আইনজ্ঞ ও বিশিষ্টজনদের অভিযোগ ছিল, আব্দুল ওয়াহহাব মিঞা প্রধান বিচারপতি হতেই ন্যায়নীতিকে বিসর্জন দিয়ে সরকারের নির্দেশনার আলোকে সব কিছু করছেন। এক সময় তিনি ন্যায়পরায়ণ বিচারপতি হিসেবে নিজেকে দাঁড় করালেও এখন তিনি পদের লোভে নীতির পথ থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন। বিচার বিভাগের স্বাধীনতার চেয়ে তিনি নিজের স্বার্থকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন।

কিন্তু শেষ অবধি সরকারের মন পেতে ব্যর্থ হলেন বিচারপতি ওয়াহহাব মিঞা। সরকারের মত অনুযায়ী বিচারকদের আচরণ ও শৃঙ্খলাবিধির গেজেট প্রকাশসহ নানা কর্মকাণ্ডে সরকারকে খুশি করার অনেক চেষ্টা করলেও সরকার তার এই গুণগানে আস্বস্ত হতে পারেনি। তাকে ডিঙিয়ে জুনিয়র সৈয়দ মাহমুদ হোসেনকেই প্রধান বিচারপতি করা হলো।

বার বার প্রত্যাখ্যাত হওয়ায় অবশেষে ওয়াহহাব মিঞা পদত্যাগ করলেন। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, আওয়ামীপন্থী আইনজীবী প্যানেল থেকে দুই বার সুপ্রিমকোর্ট বার সমিতির সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হলেও সরকার তাকে প্রধান বিচারপতি করার সাহস পায়নি। কারন তিনি সরকারের চাওয়ার বিরুদ্ধে গিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পক্ষে মত দিয়েছেন। সরকারের ভয় ছিলো আগামী নির্বাচনের আগমুহুর্তে তাকে প্রধান বিচারপতি করলে অন্যকিছু করেও ফেলতে পারেন। এছাড়া বিনা ভোটের ১৫৩ জন এমপির বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হতে পারে। যা সরকারকে ভয়ংকর পরিস্থিতিতে ফেলতে পারে।

অন্যদিকে বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন আওয়ামী লীগের খুবই অনুগত। বিগত আওয়ামী লীগ সরকার আমলে তিনি বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ পান। ২০১১ সালে তিনি আপিল বিভাগের বিচারক পদে উন্নীত হন। বিচারক হিসেবে কাজ শুরুর আগে আওয়ামী লীগ সরকার আমলে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে কাজ করেছিলেন সৈয়দ মাহমুদ হোসেন।অ্যানালাইসিস বিডি

মন্তব্য

আপনার ইমেইল গোপন থাকবে - আপনার নাম এবং ইমেইল দিয়ে মন্তব্য করুন, মন্তব্যের জন্য ওয়েবসাইট আবশ্যক নয়

*

Open

Close