Home » আন্তর্জাতিক » ‘নতুন মধ্যপ্রাচ্য’ গড়তে কায়রোতে সিসি-নেতানিয়াহু গোপন বৈঠক

‘নতুন মধ্যপ্রাচ্য’ গড়তে কায়রোতে সিসি-নেতানিয়াহু গোপন বৈঠক

‘নতুন মধ্যপ্রাচ্য’ গড়তে কায়রোতে সিসি-নেতানিয়াহু গোপন বৈঠক
.

‘আঞ্চলিক শান্তি উদ্যোগ’র নামে মধ্যপ্রাচ্যকে নতুনভাবে নিজেদের মতো করে সাজাতে কায়রোতে মিশরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল সিসির সাথে গোপন বৈঠক করেছেন ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু।

পত্রিকাটিতে সোমবার প্রকাশিত “Netanyahu, Herzog Secretly Met With Egypt’s Sissi in Cairo Last Year Amid Regional Peace Effort” শিরোনামের প্রতিবেদনে আরও জানানো হয়, ওই গোপন বৈঠকে

 

কাতার ক্রাইসিস, মরুঝড়ের পূর্বাভাস
_____________________________

কাতারের বিরুদ্ধে সৌদি নেতৃত্বাধীন রাষ্ট্রগুলোর এমন আকস্মিক পদক্ষেপ মোটেও স্বাভাবিক নয়। এই ঘটনা যেমন কাতারকে বিস্মিত করেছে, গোটা দুনিয়াকেও তা সমানভাবে আলোড়িত করেছে। কাতারের বিরুদ্ধে যেসব পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে তা রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার কোন পর্যায়েই পড়েনা। দুনিয়ার বাঘা-বাঘা রাজনীতি বিশ্লেষকরাও এর হিসাব মেলাতে হিমশিম খাচ্ছে। তবে, প্রায় সকলেই এ ব্যাপারে একমত যে, কাতার ক্রাইসিসে এখনও পর্যন্ত যা ঘটেছে তা সূচনা মাত্র। আসল টার্গেট আরও সামনে এবং তা অকল্পনীয় ভয়ঙ্কর।

#এক.
তুরস্ক-ভিত্তিক অনলাইন পোর্টাল “আজিল পোষ্ট” কাতার ক্রাইসিসকে নজিরবিহীন এবং অত্যন্ত ভয়ঙ্কর চক্রান্ত আখ্যায়িত করে লিখেছে-
কাতারের বিরুদ্ধে যা করা হচ্ছে তা রাজনীতির বিচারে কোনোভাবেই বোধগম্য নয়। কাতারের বিরুদ্ধে যে অভিযোগগুলো আনা হয়েছে সেগুলোকে সত্য হিসেবে ধরে নিলেও তা এমন পর্যায়ের কোন অপরাধ নয় যে, তার জন্য এমন অমানবিক পদক্ষেপ নেয়া যায়। এখন যা করা হচ্ছে তা সম্পূর্ণ যুদ্ধ ঘোষণার শামিল। কেবল যুদ্ধের নামটি মুখে নেয়া হচ্ছেনা। এর দ্বারা বোঝা যায় যে, কাতার সংকট সাগরের সারফেসে ভেসে উঠা বিশাল ডুবুচরের চূড়া মাত্র। তার গোঁড়া আরও অনেক গভীরে লুকায়িত। কাতার ভূমিকা মাত্র, আসল লক্ষ্য আরও অনেক বড় কিছু।

সংবাদ মাধ্যমটির পর্যবেক্ষণ মতে প্রকৃত টার্গেট ফিলিস্তিন। এটা ঘটনার শুরু থেকেই ইসরাইলী নেতাদের বক্তব্য বিবৃতি থেকে আঁচ করা গিয়েছিল। ইহুদীরা আরবদের মেরুদণ্ড ভাঙ্গার অপেক্ষায় ছিল। ২০১১ সাল থেকে নিয়ে ২০১৭ সাল পর্যন্ত, এই সময়ের মধ্যে আরবরা পরস্পর হানাহানি, যুদ্ধ-বিগ্রহের মাধ্যমে নিজেরকে যেভাবে পতনের দোরগোড়ায় নিয়ে গিয়েছে তা ইসরাইলের জন্য সুবর্ণ সুযোগ বয়ে আনে। ইসরাইল এখন আর কালক্ষেপণ করতে রাজি নয়। ৭০ বছর ধরে গলায় বিঁধে থাকা কাঁটাটি এখন তারা এক ঝটকায় সরিয়ে দিতে চায়। ট্রাম্পকে ক্ষমতায় আনার এটা একটা বড় কারণ হতে পারে। নির্বাচনে ট্রাম্পের বিজয় লাভের পর থেকেই শুরু হয় মূল পরিকল্পনা। পরিকল্পনা অনুযায়ী তিনটি পক্ষ এক সাথে কাজ করবে। কয়েকটি আরব দেশ, ট্রাম্প এবং ইসরাইল। ট্রাম্পের বিজয়ের অল্প কয়েকদিনের ভেতর মিসরের আব্দুল ফাত্তাহ সিসি, জর্ডানের বাদশাহ আব্দুল্লাহ, আরব আমিরাতের ভাইস প্রেসিডেন্ট মুহাম্মাদ বিন যায়েদ এর সাথে হোয়াইট হাউজে ট্রাম্পের একান্ত বৈঠকগুলো তখনই সন্দেহের উদ্রেক করেছিল। জেনারেল সিসি আমেরিকা থেকে ফিরে এসে বলেছিলেন- ‘আমরা খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি চুক্তির দোরগোড়ায় আছি। এটাকে (তার ভাষায়) “সাফকাতুল কারান” বা একুশ শতকের সবচেয়ে বড় চুক্তি আখ্যা দেয়া যেতে পারে।’ ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাসের সাথে বৈঠকে ট্রাম্প বলেছিলেন- “আমি ফিলিস্তিন ইস্যুর সমাধান বের করে ছাড়ব। তবে, এ জন্য ফিলিস্তিনিদেরকে কিছু “বেদনাদায়ক ছাড়” দিতে হবে। দ্বি-রাষ্ট্রের ধারণা আঁকড়ে ধরে রাখলে চলবে না।” তখন “বেদনাদায়ক ছাড়” বলতে ট্রাম্প কি বুঝিয়েছিলেন তা তখন স্পষ্ট না হলেও এখন তা ধীরে ধীরে স্পষ্ট হচ্ছে।

পরিকল্পনা অনুযায়ী তাদের কাজ শুরু হবে গাজা দিয়ে। গাজার সর্বশেষ প্রতিরোধ বুহ্যকে তারা উপড়ে ফেলবে। ইসরাইলের প্রভাবশালী পত্রিকা Haaretz কিছুদিন পূর্বে এ বিষয়ে একটি প্রতিবেদন ছাপায়। প্রতিবেদন অনুযায়ী “ইসরাইল গাজায় বেশ বড় ধরণের অভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছে। এই হামলা আগের যেকোনো হামলা থেকে আলাদা হবে।” পূর্বের যুদ্ধগুলোতে তারা ১৫/২০ দিন ধরে হামলা করতো এবং ১০০০/২০০০ ফিলিস্তিনিকে হত্যা করে ফিরে যেতো। এবার তারা সেরকম কিছু করতে রাজি নয়। এবার তারা ফিলিস্তিন নাটকের ইতি টানতে চায়।
তাদের কার্যক্রম হতে পারে এভাবে –

প্রথমে গাজার উপর প্রচণ্ড বিমান হামলা শুরু করবে। বেসামরিক জনগণকে টার্গেট করে হামলা করা হবে এবং জান-মালের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি করবে। উদ্দেশ্য সাধারণ জনগণের মনে ভয় ঢুকিয়ে দেয়া। এভাবে দু’একদিন চলার পর আমেরিকা শান্তির পায়রা হয়ে ছুটে আসবে এবং বেসামরিক জনগণকে রক্ষা করার জন্য আরব আর ইসরাইলকে চাপ দেবে। আমেরিকার নির্দেশে মিসর তার রাফা সীমান্ত খুলে দেবে এবং গাজার নাগরিকদেরকে মিসরে সরে আসার আহবান করবে। হামাস যদি তাতে বাধা দিতে চায় তাহলে তার বিরুদ্ধে বেসামরিক জনগণকে মানব ঢাল হিসেবে ব্যাবহার করার অভিযোগ তোলা হবে। সব বেসামরিক নাগরিক সরে আসার পর ইসরাইলী পদাতিক বাহিনী ট্যাঙ্কসহ অন্যনায় ভারী অস্ত্র নিয়ে গাজায় ঢুকবে এবং পুরা গাজাকে মানবশুন্য বধ্যভূমিতে পরিণত করবে।

এর পর শুরু হবে দ্বিতীয় পর্ব।

জাতিসঙ্গ এবং আমেরিকা বলবে যে, ফিলিস্তিন সমস্যার স্থায়ী সমাধান বের করার সময় হয়েছে। আর বেশী দিন এভাবে চলতে পারেনা। এবার বিশ্ব মোড়লরা ফিলিস্তিনের কফিনে সর্বশেষ পেরেক ঠুকে দেয়ার কাজটি সেরে ফেলবে। সিদ্ধান্ত হবে –

১. গাজাকে মিসরের হাতে সোপর্দ করা হবে।
২. পশ্চিম তীরের অল্প কিছু জায়গা জর্ডানের ভাগে দেয়া হবে। আর বাকীটা হবে অখণ্ড ইহুদী রাষ্ট্র ইসরাইল। এভাবে কলমের এক খোঁচায় দ্বি-রাষ্ট্রের ধারণাকে চিরতরে দাফন করে দেয়া হবে।

তারপর কায়রো বা রিয়াদে আরব সম্মেলন আহবান করা হবে। সম্মেলনে আরব শাসকেরা কিছু লোক দেখানো মেকি আস্ফালন দেখাবে। কিন্তু শেষে ফিলিস্তিনিদের বৃহত্তর স্বার্থের দিকে তাকিয়ে (!) আন্তর্জাতিক মহলের সিদ্ধান্তকে মেনে নেবে। এভাবে হযরত ওমর আর সালাহউদ্দিনের ফিলিস্তিন ইতিহাসের গভীরে তলিয়ে যাবে। কর্ডোভা, ভ্যালেন্সিয়া, গ্রানাডার পাশে আরও কয়েকটি নাম যুক্ত হবে- কুদস, রামাল্লা, আসকালান, গাজা।

এগুলো আমার চিন্তাপ্রসূত কোন ধারণা নয়, বরং ইসরাইলী পত্রিকাগুলো প্রায় প্রতিদিনই এগুলো লিখছে। ট্রাম্পের স্পষ্ট বক্তব্য তো আগেই উল্লেখ করা হয়েছে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে হোয়াইট হাউজের একজন প্রভাবশালী কর্মকর্তা স্পষ্ট করে বলেন- “ফিলিস্তিন সমস্যরা সমাধানের ক্ষেত্রে আমেরিকা এখন আর দ্বি-রাষ্ট্র নীতিকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেনা। স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা করার জন্য যেকোনো সিদ্ধান্ত নিতে হবে, তা যত কঠিনই হোক না কেন।”

কিন্তু এই মহাপরিকল্পনার বেশ বড় কিছু বাধা আছে। হামাস, ইখওয়ান, আল-জাজিরা, কাতার, তুরস্ক এবং পাকিস্তান।
কাতার ক্রাইসিসের মাধ্যমে প্রথম চারটির যাত্রা শুরু হল। যদি তারা কাতারের ক্ষেত্রে সফল হয় তাহলে নাটকের দ্বিতীয় পর্ব শুরু করবে। কাতারের মতো অন্যান্য দেশগুলোর দিকে ধাবিত হবে। তালিকার প্রথমেই থাকবে তুরস্ক এবং পাকিস্তান।

#দুই.
গতকালের লেখায় মার্কিন প্রশাসনের অবস্থান সম্পর্কে যা বলা হয়েছিল তা মনে হয় পুরোপুরি সঠিক না। আগে ধারণা ছিল কাতার ইস্যু নিয়ে ট্রাম্প আর তার প্রশাসনের মধ্যে বিরোধ চলছে। কিন্তু বেশ কয়েকজন বিশ্লেষক এই ধারণাকে নাকচ করে দিয়ে জোর দিয়ে বলেছেন যে, এটা তাদের একটা কৌশল। পেন্টাগন, মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রণালয় এবং ট্রাম্প পরস্পর বিরোধী বক্তব্য দিয়ে কাতার এবং কাতারের পক্ষের শক্তিগুলোকে বিভ্রান্ত করতে চায়। উদ্দেশ্য কাতারকে কোন কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে না দেয়া এবং এই ফাঁকে অবরোধকারী পক্ষগুলোকে তাদের অবরোধ আরও কঠোর করার জন্য পর্যাপ্ত সময় দেয়া। ট্রাম্পের গতকাল রাতের বক্তব্য থেকে তা স্পষ্ট হয়েছে। একদিন আগে কাতারের আমীরকে ফোন করে নিরপেক্ষ থাকার বার্তা দিয়েছিলেন, কিন্তু কালকে তিনি কাতারকে “সন্ত্রাসের ঐতিহাসিক অর্থায়নকারী” হিসেবে আখ্যা দিয়ে কাতারের কড়া সমালোচনা করেন। এগুলো ভুল বশত কিংবা ছেলেমানুষি কোন বক্তব্য নয়। এর বড় কোন তাৎপর্য অবশ্যই আছে। পর্যবেক্ষকদের ধারণা মতে কাতারের অবরোধের সিদ্ধান্ত ট্রাম্পের নয়, বরং পেন্টাগন আর পররাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের দীর্ঘদিনের নিখুঁত পরিকল্পনা। তারা এক ঢিলে অনেকগুলো পাখী শিকার করতে চায়- হামাস ইখওয়ানকে ধ্বংস করে ইসরাইলের নিরাপত্তা আরও মজবুত করা বা ফিলিস্তিন ইস্যুকে চির তরে দাফন করা। কাতারকে শায়েস্তা করে অন্যান্য বেয়াড়া রাষ্ট্রগুলোকে এই বার্তা দেয়া যে, আমাদের গণ্ডির বাইরে গিয়ে খেলতে চাইলে কাতারের পরিণতি ভোগ করতে হবে। আরব রাষ্ট্রগুলোর সাথে তুরস্কের গড়ে উঠতে থাকা বানিজ্যিক এবং রাজনৈতিক সম্পর্ককে নষ্ট করে দিয়ে তুরস্কের অগ্রযাত্রা ব্যাহত করা। কুর্দি ইস্যু নিয়ে এরদোগান ট্রাম্পকে বেশ কড়া কথা শুনিয়ে এসেছেন আমেরিকা সফরে গিয়ে। তখন ট্রাম্প হাসির আড়ালে ক্ষোভ লুকালেও তুরস্ককে জব্দ করার চিন্তা বাদ দেননি। এই কৌশলে তিনি একশো ভাগ সফল হয়েছেন। তুরস্ক কাতারের পক্ষে অবস্থান নেয়ার সাথে সাথেই স্কাই নিউজ, আল আরাবিয়া টেলিভিশন, সৌদি পত্রিকা ‘ওকাজ’সহ সৌদি-আমিরাতের প্রায় সবকটি গণমাধ্যমে তুরস্ককে নিয়ে নেতিবাচক প্রচারণা শুরু হয়েছে। এমনকি হুমকি ধমকিও দেয়া হচ্ছে। সামাজিক মাধ্যমগুলোতে তুর্কি পন্য বর্জন করার আহ্বান করা হচ্ছে। বেশ কয়েক বছর ধরে কঠোর পরিশ্রম করে এরদোগান সৌদিসহ আশপাশের আরব দেশগুলোর সাথে সম্পর্ক উন্নয়ন করেছেন। কিন্তু কাতার-ঝড় তা এক ধাক্কায় উড়িয়ে নিয়ে গেলো। নিশ্চিতভাবেই এখন তুরস্ক আরব উপদ্বীপের বিশাল বাজার হারাতে যাচ্ছে। কিন্তু তুরস্ক এই ত্যাগ দিতে বাধ্য রাজনৈতিক কারণে। কারণ তুরস্কের নিরপেক্ষ নীতির কারণে যদি কাতারের পতন ঘটে তাহলে তার পরিণতি তুরস্কের জন্য আরও বেশী ভয়ানক হবে। তাই রাজনৈতিক স্বার্থ রক্ষা করতে গিয়ে অর্থনৈতিক স্বার্থকে বিসর্জন দিতে হচ্ছে। এরদোগান শুরু থেকে বেশ সংযমী আচরণ করেছেন। হুমকি ধমকি না দিয়ে বাদশাহ সালমানের সাথে ফোনে সংকট নিয়ে আলাপ করেছেন এবং আলোচনার মাধ্যমে সংকটের সমাধান বের করার আহ্বান জানিয়েছেন। সব পক্ষ রাজি হলে তিনি মধ্যস্থতা করার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। কুয়েতের আমিরের সাথে দফায় দফায় ফোন করে আলোচনার আপডেট জেনে নিচ্ছেন। সরকারের কোন দায়িত্বশীল ব্যাক্তিকে উল্টাপাল্টা আবেগি কোন বক্তব্য দিতে কড়াভাবে নিষেধ করে দিয়েছেন। তুরস্কের গণমাধ্যমকে তিনি কাতার সংকটকে খুব সতর্কতার সাথে কাভার করার পরামর্শ দিয়েছেন। কারণ, তিনি জানেন যে, এই খেলার আসল লক্ষ্য অনেক বড়। এই আগুন যদি সহজে নেভানো সম্ভব না হয় তাহলে তা শুধু কাতার তুরস্ককে নয়, বরং গোটা মধ্যপ্রাচ্যকে জ্বালিয়ে ছারখার করে দেবে।

#তিন.
কাতারের বিরুদ্ধে সৌদি জোটের এমন সর্বাত্মক অবরোধ এবং তাদের লাগাতার আস্ফালন দেখে মনে হচ্ছে তারা খুব আটঘাট বেঁধে নেমেছে। তারা পেছনে আসার জন্য এই খেলায় নামেনি। কিছুক্ষণ পরপর টুইটের মাধ্যমে ট্রাম্প তাদেরকে বেশ সাহস জুগিয়ে চলেছেন। এখন হয়তো কাতারকে তাদের কথা মেনে নিতে হবে আর না হয় দাঁতে দাঁত চেপে তাদের মোকাবেলা করে যেতে হবে। কাতার যদি শেষ পর্যন্ত তাদের কথায় না আসে তাহলে তাদের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙ্গে যেতে পারে এবং সরাসরি কাতারের আমীর পরবারের বিরুদ্ধে অভ্যুত্থান ঘটানোর চেষ্টা করতে পারে। বরং বর্তমান দৃশ্যে যা দেখা যাচ্ছে তাতে আমার মনে হচ্ছে তারা অভ্যুত্থানের পরিকল্পনা নিয়ে এগুচ্ছে। এটা নতুন কিছু নয়। ১৯৯৬ সালে সৌদি আরব কাতারে বিদ্রুহ ঘটানোর চেষ্টা করেছিল। সবকিছু পাকাপাকি হয়ে গিয়েছিল। বিদ্রোহ শুরু হওয়ার ঠিক আগ মুহূর্তে এসে বিদ্রোহ পরিকল্পনায় অংশগ্রহণকারী কিছু লোক ঘটনা ফাঁস করে দিয়ে রাষ্ট্রের কাছে ক্ষমা চায়। ঐ যাত্রায় কাতার বেচে যায়। এবার তারা তাদের সেই অসম্পূর্ণ কাজটি সেরে ফেলতে চাইতে পারে। কয়েকজন সৌদি নেতা তো তা সরাসরি ঘোষণাও করেছেন। একজন আমেরিকা থেকে বলেছেন – “আমরা জানি তামিম শেষ পর্যন্ত আমাদের সামনে নত হবে, আর না হলে তাকেও মুরসির পরিণতি বরণ করতে হবে।”

কাতার সরকারও এই হুমকিকে খুব গুরুত্বের সাথে দেখছে। এ জন্য কাতারের আমীর বাইরের সফরে বের হওয়ার ঝুঁকি নিচ্ছেন না। প্রভাবশালী বিভিন্ন গোত্রকে আমীরের প্রতি তাদের বাইআত এবং পূর্ণ আস্থার কথা জনসম্মুখে ঘোষণা করতে উৎসাহ করা হচ্ছে। সেনা ইউনিটগুলোকে অত্যন্ত সতর্কাবস্থায় রাখা হচ্ছে। এখানে তুরস্কে এবং পাকিস্তানের সেনা উপস্থিতির কথা আসতে পারে। তবে আমার মনে হয় তুর্কি এবং পাকিস্তানি সেনারা অভ্যুত্থান ঠেকাতে খুব বেশী কাজে আসবে বলে মনে হয়না। কারণ, তারা বিদেশি আগ্রাসন ঠেকাতে পারবে, কিন্তু অভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে সরাসরি দাঁড়াতে গেলে কাতারের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করছে বলে আমেরিকা এবং সৌদি জোট তাদের উপর প্রবল চাপ সৃষ্টি করতে পারে। তবে এই চাপ তারা মোকাবেলা করতে পারবে। কারণ তারা একটি বৈধ সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঠেকাতে সে দেশের সরকারকে সহযোগিতা করছে এমন যুক্তি দেখাতে পারে।যেমনটি সৌদি জোট ইয়ামেনে করছে।

উপরের কথাগুলো বলার উদ্দেশ্য হতাশা সৃষ্টি করা নয়; বরং যতোটুকু সম্ভব প্রকৃত ঘটনার সাথে পাঠককে পরিচিত হওয়ার সুযোগ করে দেয়া। সত্য যতই অপ্রিয় ও বেদনাদায়ক হোক, তাকে জানার মধ্যেই কল্যান। উটপাখির মতো বালিতে মাথা ঢুকিয়ে বসে থাকা কোন সমাধান নয়। সংকট যেমন বড়, আল্লাহ তা মোকাবেলা করার মতো মানুষের ব্যাবস্থাও করেছেন, তাঁদের সংখ্যাটা যত কমই হোক না কেন। আমাদের দোয়া আর তাঁদের প্রচেষ্টা এক হলে আল্লাহর রহমত আসতে খুব বেশী দেরী লাগবেনা ইন শা আল্লাহ।

#চার.
সৌদি আরবের আলেমগনের বড় একটি অংশের ভুমিকা পুরা দুনিয়ার মুসলমানদেরকে হতাশ করেছে। তারা তাদের অবরুদ্ধ ভাইদের প্রতি নুন্যতম সহানুভূতি জানাতে ব্যর্থ হয়েছে। এই ভ্রাতৃঘাতী দ্বন্ধ নিরসনের তাদের কোন পদক্ষেপ আমাদের চোখে পড়েনি। উল্টো তাদের শাসকদের খুশী করতে তাদের বিভিন্ন ফোরাম থেকে বড় বড় আলেমদের সদস্যপদ বাতিল করছে। তারা তাদের সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করুক তা কেউ বলছেনা। কিন্তু তাদের শাসকদেরকে তো নাসিহাত করতে পারে।

কোন কোন ভাইকে দেখলাম আমাদের আকাবির ওলামায়ে কেরামের সাথে শাসকদের সম্পর্ক এবং ব্যাবহার কেমন ছিল সেই বিষয়ে খুব গুরুত্বপূর্ণ লেখা লিখেছেন। পড়ে উপকৃতও হয়েছি। কিন্তু তাঁদের কথার সাথে অধিকাংশ ক্ষেত্রে একমত হওয়া গেলেও উপসংহারের সাথে একমত হওয়া কঠিন। কারণ ‘ফেতনা থেকে বাঁচার’ নামে নাসিহাত ছেড়ে দেওয়াকে ইসলাম সমর্থন করে বলে আমার জানা নেই। আর ‘সৃষ্টিকর্তার আবাধ্য হয়ে কারও আনুগত্য করা’ থেকে ইসলাম চরম ভাবে নিষেধ করেছে বলে জানি। আপনি সিরিয়ার পরিণতির কথা চিন্তা করে মুখ খুলতে রাজি নন, কিন্তু আপনার এই নীরবতা যে লাখ লাখ নিরাপরাধ মানুষের নুন্যতম অধিকার কেড়ে নিচ্ছে, আরেকটি মুসলিম জনপদকে বিরান করে দিচ্ছে, আপনার নিরবতার সুযোগে আপনার শাসকগণ দুশমনদের সাথে উম্মাতের তাকদির নিয়ে সওদা করছে তাতে আল্লাহ আপনার উপর আপনার এই ‘হেকমতপূর্ণ নিরবতায়’ অনেক বেশী সন্তুষ্ট হবে বলে মনে করেন? স্পেনের পতন তো আমি নিজ চোখে দেখিনি। বইয়ের পাতায় পড়েছি। তাওায়েফী শাসকদের হাতে কিভাবে মুসলিম স্পেনের তরী ধীরে ধীরে ডুবেছিল তার বিশদ বর্ণনাও পড়েছি। সেখানে ‘দরবারী কবি’ আর ‘মুসাহেব আলেমদের’ যে বীভৎস রূপ দেখেছি, তাতে মনে হয়েছে মুসলমানদের করুন পরিণতির জন্য শাসকদের আত্মকলহের পাশাপাশি তাদের ‘ভয়ঙ্কর নির্লিপ্ততা’ কোন অংশে কম দায়ী ছিলোনা। এই জন্যই বা-ইয়ুল উমারা ইমাম ইজ্জ ইবনে আব্দুসসালামকে খুব বেশী স্মরণ করি। তাঁর পথকেই সবচেয়ে সঠিক পথ বলে মনে করি। ইবনে তাইমিয়া রাহ তাঁর জীবনের বড় একটি অংশ কাটিয়েছিলেন জেলে বসে। শুধু শাসকদের সাথে আপোষ করেন নি বলে। তাদের মুখের উপর সবসময় সত্য কথা উচ্চারণ করতেন বলে। ‘রাফউল ইয়াদাইন’এর মাসালায় যদি তাঁর অনুসরন করতে পারি তাহলে ‘সত্য উচ্চারণের’ ক্ষেত্রে কেন নয়?!

আল্লহ আমাদের হেফজত করুন।

মন্তব্য

আপনার ইমেইল গোপন থাকবে - আপনার নাম এবং ইমেইল দিয়ে মন্তব্য করুন, মন্তব্যের জন্য ওয়েবসাইট আবশ্যক নয়

*

Open

Close