ব্রেকিং:
Home » ইসলাম » নবী মুহাম্মাদ (সা.) দেখতে কেমন ছিলেন?

নবী মুহাম্মাদ (সা.) দেখতে কেমন ছিলেন?

শামায়েল গ্রন্থকারকগণ প্রথমেই রাসুল সা.-এর দৈহিক বৈশিষ্ট্য আলোচনা করেন এবং এর মধ্য দিয়ে তার অবয়ব-প্রকৃতি তুলে ধরার চেষ্টা করেন।

দৈহিক গঠন বর্ণনাকারীর সংখ্যা বেশি নয়: রাসুল সা.-এর হাদিস বর্ণনাকারী সাহাবায়ে কেরামের সংখ্যা অগুণতি পর্যায়ের হলেও যখনই আমরা তার গঠন-প্রকৃতি বিষয়ে অবগত হতে চাই, দেখি যে, বর্ণনাকারীর সংখ্যা অনেক কম। এর কয়েকটি কারণও আমরা নিরুপণ করতে পারব- প্রথমত শরীয়তের বিধিবিধান সম্পর্কি নবীজির কথা ও কাজের বর্ণনা করেছেন তারা বেশি, আর রাসুল সা.-এর গঠন বর্ণনা তেমন কোনো বিষয় নয়। তাই এই বিষয়ে তারা যথেষ্ট মনোযোগ দেননি। বরং রাসুল সা. তাদের মাঝে উপস্থিত থাকার কারণে এর খুব একটা প্রয়োজনও তাদের ছিল না। তাদের প্রত্যেকেই রাসুল সা.-কে চাইলেই দেখতে পারতেন। তাই মুখ্য বিষয় হিসেবে তার গঠন-প্রকৃতি কমই বর্ণনা আমার পাই না, বরং অন্য বিষয়ক হাদিসের ভেতরে অন্তর্গতভাবে এর বর্ণনা রয়েছে। এমনকি এ-বিষয়ক একটি পূর্ণাঙ্গ সহীহ হাদিসও কোনো একজন সাহাবী থেকে পাওয়া যায় না। তাদের কেউ কেউ বর্ণনা করেছেন বটে। তবে প্রচুর হাদিস আছে, তা হলো একটি বা দুটি শব্দ এ-বিষয়ে রয়েছে।

দ্বিতীয়ত- সাহাবাদের অন্তরে রাসুল সা. থাকতেন শ্রদ্ধভীতির প্রভাব নিয়ে। তারা কাছে ছিলেন বটে, একই স্থানেই থাকতেন। কিন্তু এই ভয় তাদেরকে দূরে সরিয়ে রাখত। এই বাস্তবতাকে আমর ইবনুল আস রা. এক হাদিসে এভাবে বর্ণনা করেছেন, ‘আমার কাছে রাসুল সা.-এর চেয়ে প্রিয় কোনো মানুষ ছিল না। আমার দু’চোখে তার চেয়ে মযার্দাবান কেউ নেই। কিন্তু আমি কখনো পরিপূর্ণ দৃষ্টি মেলে তাকে দেখতে পারতাম না। তাই যদি তার বিবরণ কেউ জানতে চায়, আমি বলতে পারব না। কারণ তাকে চোখ ভরে কখনো দেখতে পারি নি’। [মুসলিম, হাদিস ১২১]প্রত্যেক সাহাবীর অবস্থাই ছিলো এমন।

তৃতীয়ত- মানুষের গঠন-সৌষ্ঠব বর্ণনা করাও কঠিন। খুব কম মানুষই মানুষের গঠন-প্রকৃতি সংক্ষেপে বর্ণনা করার মতো যথাশব্দ ব্যবহারের যোগ্যতা রাখে। কারণ মানুষের দেহের গঠন বিভিন্ন ধরনের হয়। আমরা কেবল শরীরের দৈর্ঘ্য বিবরণের জন্য লম্বা, মাঝারি ও খাটো-এই তিনটি শব্দ ব্যবহার করতে পারি। অথচ লম্বারও অনেক আকৃতি রয়েছে। তেমনি মাঝারি ও খাটো আকৃতিরও রয়েছে বিভিন্ন ধরন।

এমনই ফর্সা রঙ, কালো চোখ, গোল মুখাকৃতি-এর প্রতিটি রূপ বর্ণনা করার মতো সূক্ষ্ম পরিমাপক নেই। সঠিকভাবে বর্ণনা করার শব্দভা-ারও অফুরন্ত নয়। তাই সাহাবায়ে কেরাম তার আকৃতি বর্ণনা করার জন্য অন্য আকৃতির আশ্রয় নিয়ে তুলনা করেছেন। আবু জুহাইফা রা.-কে রাসুল সা. সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেছেন, রাসুল সা. দেখতে ছিলেন অনেকটা হাসান ইবনে আলী রা.-এর মতো। [বুখারী, হাদিস ৩৫৪৩] তাবেয়ীদের কাছে তার বিবরণ তুলে ধরার জন্য এটাই ছিলো সবচে’ উপযুক্ত ও উত্তম পন্থা।

গঠন-বৈশিষ্ট্য বর্ণনার প্রয়োজন কখন হলো : সাহাবীদের যুগে রাসুল সা.-এর দৈহিক বিবরণ দেবার প্রয়োজন ছিলো না। যেহেতু তিনি নিজেই ছিলেন তাদের মধ্যে বিদ্যমান। এ-ছাড়া দূরে বা কাছের সকল সাহাবী যেনো হাজির থাকতে পারে, তাই তিনি বহু আগেই বিদায় হজের ঘোষণা দিয়েছেন। ফলে যারা তখনো দেখেননি তাদের প্রত্যেকের জন্য নবীজিকে দেখার একটি সুযোগ তৈরি হয়ে যায়। এরপর রাসুল সা.-এর ওফাত হয়ে গেলে এলো তাবেয়ীদের যুগ। তাবেয়ীগণ এমন একটি সময় পেয়েছিলেন যখন তাদের নামাজ, রোযা, পনাহারের আদব, মসজিদে প্রবেশ, এক কথায় জীবনের সকল ইবাদত ও কাজকর্ম রাসুল সা.-এর আদর্শ অনুযায়ী হতো। অচিরেই তাদের মাঝে রাসুল সা.-এর গাঠনিক দিকটি জানার আগ্রহ দেখা দিল; যদিও তারা রাসুল সা.-এর আদর্শ, চরিত্র ও আচরণের পরিচয় ইতোমধ্যে লাভ করেছেন। এবং তা জানার একমাত্র পথ ছিল তাদের সামনে থাকা সাহাবীদের জিজ্ঞেস করা। কেননা, তারাই কেবল রাসুল সা.-কে পেয়েছেন এবং তার সাহচর্যে ধন্য হয়েছেন। সুতরাং সাহাবীদের কাছে বারবার প্রশ্ন আসতে থাকে, যেন তারা গঠন-প্রকৃতি বর্ণনার মাধ্যমে রাসুল সা.-কে অঙ্কিত করে, যেমন আমরা ইতোমধ্যে জুহাইফা রা.-এর বর্ণনা থেকে বুঝতে পেরেছি।

এই প্রশ্নাধিক্যের কারণ ছিল প্রজন্মান্তরে অব্যাহত থাকা হৃদয়স্থিত নবিপ্রেম। উম্মতের এই নবিপ্রেম ও দর্শনেচ্ছার কথা রাসুল সা. নিজেও জানতেন। তাই তিনি বলেছেন- তোমাদের সামনে একটি সময় আসবে যখন মানুষের কাছে গচ্ছিত সম্পদ ও পরিজনের মতোই আমার সাক্ষাৎ তাদের কাম্য হবে। [মুসলিম, হাদিস ৩৪৬৪]

অন্য হাদিসে এসেছে- আমার পরে উম্মতের মধ্যে আমার প্রতি এতোটা ভালোবাসাসম্পন্ন লোক আসবে, যারা তাদের সম্পদ-পরিজনের বিনিময়ে হলেও আমাকে দেখতে চাইবে। [মুসলিম, হাদিস ২৮৩২] সুতরাং সাহাবায়ে কেরাম রাসুল সা.-এর বিবরণ তুলে ধরা শুরু করলেন, কখনো সংক্ষেপে, কখনো সবিস্তারে, আবার কখনো-বা আংশিক। তবে সত্য কথা হলো, শ্রোতা কখনোই দর্শকের তৃপ্তি পায় না।

বান্দার প্রতি আল্লাহর এক অব্যাহত অপার অনুগ্রহ হলো, তিনি কাউকে কাউকে স্বপ্নযোগে রাসুল সা.-এর দর্শন লাভের সুযোগ দান করেন। এই স্বপ্ন সত্য। রাসুল সা. ইরশাদ করেছেন- যে ব্যক্তি আমাকে স্বপ্নযোগে দেখেছে, সে আমাকেই দেখেছে। কেননা, শয়তান আমার রূপ ধারণ করতে পারে না। [বুখারী, হাদিস ২৫৫২]

সহীহ হাদিসে গঠনের বিবরণ : এখানে আমারা রাসুল সা.-এর আকার-আকৃতি বিষয়ক বুখারী ও মুসলিমের হাদিস বর্ণনাতেই ক্ষান্ত দেব। অন্যান্য কিতাবের হাদিস প্রকারন্তরে বুখারী মুসলিমেরই হাদিস। এমনকি শামায়েলে তিরমিযীর সহীহ হাদিসগুলোও বুখারী এবং মুসলিমের হাদিসের সাথে শাব্দিক বা অর্থগত দিক থেকে মিল রাখে।

বারা ইবনে আযেব রা. বলেন, ‘রাসুল সা. ছিলেন মাঝারি গড়নের। তার উভয় বাহুমূলের মধ্যবর্তীস্থান অন্যদের তুলনায় কিছুটা প্রশস্ত ছিল। তার মাথার কেশরাশি উভয় কানের লতি পর্যন্ত প্রলম্বিত ছিল। পরনের লাল পোশাকে তার চেয়ে অধিক সুন্দর আমি কাউকে দেখিনি’।

অন্য বর্ণনায় আছে- রাসুল সা. ছিলেন সবচে’ সুন্দর চেহারা ও গঠনের অধিকারী; অতি লম্বাও না, খাটোও না।

অন্য হাদিসে আছে- বাবরি চুল বিশিষ্ট লাল পোশাক পরিহিত কোনো লোককে রাসুল সা. এর চেয়ে অধিক সুদর্শন দেখিনি। তার চুল কাঁধ ছুঁয়ে যেত।

বারা রা.-কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছে, রাসুল সা.-এর চেহারা কি তরবারির মতো ছিল? তিনি জবাব দিলেন, ‘না; বরং চাঁদের মতো’। [বুখারী, হাদিস ৩৫৪৯, ৩৫৫১, ৩৫৫২]

আনাস ইবনে মালেক রা. বলেন, ‘রাসুল সা. অতি লম্বা ছিলেন না, আবার খাটোও না। তিনি ধবধবে সাদা ছিলেন না, আবার সম্পূর্ণ তামাটে বর্ণেরও না। কুঞ্চিত চুল বিশিষ্ট ছিলেন না, আবার তার চুল একেবারে সোজাও ছিল না’।

অন্য বর্ণনায় আছে, তিনি ছিলেন মাংসল হাত-পা ও সুদর্শন চেহারার অধিকারী। আমি পূর্বে বা পরে কাউকে তার মতো দেখিনি। তার হাতের তালু ছিল প্রশস্ত।

আবু তুফাইল রা. বলেন, ‘রাসুল সা. ছিলেন ফর্সা লাবণ্যময় আকর্ষণীয়। অন্য বর্ণনায় আছে, তিনি ছিলেন ফর্সা ও লাবণ্যময় চেহারার অধিকারী’। [মুসলিম, হাদিস ২৩৪০]

জাবের ইবনে সামুরা বলেন, ‘রাসুল সা.-এর মুখবিবর ছিল কিছুটা প্রশস্ত, চোখ ছিলো টানা। পায়ের গোড়ালি ছিল হালকা গোশতবিশিষ্ট’। [মুসলিম, হাদিস ২৩৩৯]

তিনি আরও বলেন, রাসুল সা.-এর মাথার অগ্রভাগের কিছু চুল ও কিছু দাড়ি ধুসর বর্ণের হয়ে গিয়েছিল। তেল ব্যবহার করলে তা প্রকাশ পেত না। চুলগুলো এলোমেলো থাকলে বোঝা যেত। তিনি ছিলেন ঘন দাঁড়িবিশিষ্ট। কেউ বলল, তার চেহারা কি তলোয়ারের মতো ছিল? তিনি বললেন, না; বরং চাঁদ-সূর্যের মতো, গোলাকৃতির। তার স্কন্ধদেশে মোহরে নবুয়ত দেখেছি কবুতরের ডিমের মতো; তার শরীরের বর্ণেরই। [মুসলিম, হাদিস ২৩৪৪]

আনাস রা. বলেন, ‘রাসুল সা.-এর হাতের তালুর মতো কোমল রেশমও আমি স্পর্শ করি নি। এবং তার শরীরের ঘ্রাণের চেয়ে উত্তম কোনো ঘ্রাণ অনুভব করিনি। অন্য বর্ণনায় এসেছে, রাসুল সা. ছিলেন উজ্জ্বল বর্ণের। তার ঘাম মুক্তার মতো চকচক করত। হাঁটার সময় তিনি সামনের দিকে একটু ঝুঁকে হাঁটতেন’। [বুখারী, হাদিস ৩৫৬১]

জাবের ইবনে সামুরা রা. থেকে বর্ণিত, শৈশবে রাসুল সা. তার গালে হাত বুলিয়েছিলেন। তিনি বলেন, ‘আমি তার হাতে এমন শীতলতা ও সুগন্ধি অনুভব করেছি, যেন তিনি তা সুগন্ধির কস্তুরি থেকে বের করেছেন’। [মুসলিম, হাদিস ২৩২৯]

অবয়বের সৌন্দর্য : রাসুল সা.-এর দেহাবয়ব ও সৌন্দর্য বিবরণ-সম্বলিত হাদিসগুলো একত্র করলে দুটি বিষয় স্পষ্ট ফুটে উঠবে- ১. সুষম ও মধ্যম ধরন এবং ২. শরীরের প্রতিটি অঙ্গের সামঞ্জস্যপূর্ণতা। দৈর্ঘ্যে তিনি ছিলেন মাঝারি আকৃতির। বেশি লম্বা বা খাটো ছিলেন না। বর্ণের দিক থেকে ছিলেন স্বাভাবিক ফর্সা, ধবধবে সাদা বা তামাটে বর্ণের নয়, বরং উজ্জ্বল বর্ণের। তার মাথার চুল ছিল মধ্যম ধরনের, অর্থাৎ কোঁকড়ানোও না. একেবারে সোজাও না।

শরীরের প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে যথাযথ সামঞ্জস্য থাকলেই দেহের সৌন্দর্য পূর্ণতা পায়, তিনি তেমনই ছিলেন। উভয় বাহুর মধ্যবর্তী স্থানের প্রশস্ততা, উভয় হাত ও পায়ের মাংসল হওয়া এগুলো কোনো দৈহিক ত্রুটি নয়। বরং তা সামঞ্জস্যেরই বিবরণ।

মূল— সালেহ আহমদ শামী। আরবি থেকে অনুবাদ— মনযূরুল হক

মন্তব্য

আপনার ইমেইল গোপন থাকবে - আপনার নাম এবং ইমেইল দিয়ে মন্তব্য করুন, মন্তব্যের জন্য ওয়েবসাইট আবশ্যক নয়

*

Open

Close