ব্রেকিং:
Home » রাজনীতি » প্রধান বিচারপতি ও বিচারকদের নিয়োগ ও পদত্যাগ প্রসঙ্গে

প্রধান বিচারপতি ও বিচারকদের নিয়োগ ও পদত্যাগ প্রসঙ্গে

প্রধান বিচারপতি নিয়োগপ্রাপ্ত হন রাষ্ট্রপতি কর্তৃক। প্রধান বিচারপতি নিয়োগের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ গ্রহণের আবশ্যকতা নেই।প্রধান বিচারপতি বিচার বিভাগের প্রধান হিসেবে এবং সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগে একটি বেঞ্চের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করলেও সংবিধানে প্রধান বিচারপতির পদটিকে বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতি হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। এ দেশের উচ্চ আদালত হল সুপ্রিমকোর্ট। সুপ্রিমকোর্ট আপিল বিভাগ ও হাইকোর্ট বিভাগ সমন্বয়ে গঠিত।সংবিধানে উচ্চ আদালতের বিচারক নিয়োগের ক্ষেত্রে যে যোগ্যতার বিষয় উল্লেখ আছে তা হল- এ পদে নিয়োগপ্রার্থীকে বাংলাদেশের নাগরিক হতে হবে এবং তার সুপ্রিমকোর্টে অন্যূন দশ বছরকাল ওকালতির অভিজ্ঞতা থাকতে হবে অথবা বিচারবিভাগীয় পদে অন্যূন ১০ বছর কর্মের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। সংবিধানে সুপ্রিমকোর্টে বিচারক পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে আইনের দ্বারা নির্ধারিত অন্যান্য যোগ্যতার উল্লেখ থাকলেও অদ্যাবধি যোগ্যতা নির্ধারণপূর্বক এ বিষয়ে কোনো আইন প্রণীত না হওয়ায় পূর্বোল্লিখিত যোগ্যতার আলোকে উচ্চ আদালতে বিচারক পদে নিয়োগকার্য সমাধা করা হয়ে আসছে।

প্রয়োজনীয় যোগ্যতাসম্পন্ন একজন ব্যক্তিকে উচ্চ আদালতের বিচারক পদে নিয়োগ-পরবর্তী তাকে সংবিধানে উল্লিখিত বিচারকদের জন্য নির্ধারিত শপথবাক্য পাঠ করতে হয় এবং শপথ পাঠ ব্যতিরেকে তিনি বিচারক পদে আসীন হন না। প্রধান বিচারপতি এবং আপিল বিভাগে বিচারক পদে নিয়োগ সম্পূর্ণরূপে পৃথক নিয়োগ। উভয় নিয়োগের ক্ষেত্রে নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে নতুন করে শপথ পাঠ করতে হয়। সংবিধানে প্রধান বিচারপতি বা আপিল বিভাগে বিচারক নিয়োগের ক্ষেত্রে পৃথক কোনো যোগ্যতার বিষয় উল্লেখ নেই। তবে দীর্ঘকাল ধরে উভয় নিয়োগে অধিকাংশ ক্ষেত্রে আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠ বিচারক এবং হাইকোর্ট বিভাগের জ্যেষ্ঠ বিচারককে প্রাধান্য দেয়া হচ্ছে।বিচার বিভাগের নিম্নতম পদ সহকারী জজ পদের নিয়োগ পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে হলে একজন প্রার্থীর মাধ্যমিক থেকে এলএলবি স্নাতক পর্যন্ত সব পরীক্ষায় ন্যূনতম দ্বিতীয় শ্রেণীতে উত্তীর্ণ হওয়ার আবশ্যকতা রয়েছে। উচ্চ আদালতের বিচারক নিয়োগের ক্ষেত্রে অদ্যাবধি আইন প্রণয়নের মাধ্যমে শিক্ষাগত যোগ্যতার বিষয়টি উল্লিখিত না হওয়ায় শিক্ষাগত যোগ্যতার বিষয়টিকে অবজ্ঞা বা উপেক্ষা করার অবকাশ নেই।

আর এর পেছনের কারণ হল- সাংবিধানিকভাবে সর্বোচ্চ আদালতের হাইকোর্ট বিভাগকে অধস্তন সব আদালত ও ট্রাইব্যুনালের ওপর তত্ত্বাবধান ও নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। তত্ত্বাবধান ও নিয়ন্ত্রণ বিষয়ে বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত নিয়ম হল- উচ্চতর যোগ্যতাসম্পন্নরা নিম্নতর যোগ্যতাসম্পন্নদের তত্ত্বাবধান ও নিয়ন্ত্রণ করবেন। সে নিরিখে বিচার বিভাগের নিম্নতম পদে নিয়োগের বিষয়ে শিক্ষাগত যোগ্যতার বিষয়টি নির্ধারিত করে দেয়ায় এর নিম্নের যোগ্যতাসম্পন্ন কোনো ব্যক্তিকে উচ্চ আদালতে বিচারক পদে নিয়োগ দেয়ার অবকাশ নেই। প্রধান বিচারপতি বিচার বিভাগের প্রধান হওয়ার কারণে এবং সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগকে হাইকোর্ট বিভাগের রায়, ডিক্রি, আদেশ বা দণ্ডাদেশের বিরুদ্ধে আপিল শুনানি এবং তা নিষ্পত্তির এখতিয়ার প্রদান করায় প্রধান বিচারপতি ও আপিল বিভাগের বিচারকদের যথাক্রমে আপিল বিভাগের অপরাপর বিচারক এবং হাইকোর্ট বিভাগের বিচারকদের চেয়ে উচ্চতর যোগ্যতাসম্পন্ন হওয়ার আবশ্যকতা রয়েছে। কিন্তু অধিকাংশ নিয়োগের ক্ষেত্রে অনাকাক্সিক্ষতভাবে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা ও মতাদর্শকে গুরুত্ব দেয়ার কারণে যোগ্যতার বিষয়টি উপেক্ষিত থেকে যায়।

প্রধান বিচারপতি নিয়োগের ক্ষেত্রে সাংবিধানিকভাবে রাষ্ট্রপতি তার একক সিদ্ধান্তে নিয়োগকার্যটি সমাধা করতে পারলেও রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রীর আকাক্সক্ষা মুখ্য বিধায় এ নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর আকাক্সক্ষার বিপরীতে রাষ্ট্রপতি নিয়োগকার্যটি সমাধা করতে চাইলে তার জন্য বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়ার উপক্রম ঘটতে পারে। রাষ্ট্রপতি নির্বাচন প্রক্রিয়ার দিকে দৃষ্টিনিবদ্ধ করলে দেখা যায়, তিনি সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যদের ভোটে নির্বাচিত হন। উল্লেখ্য, সংসদ সদস্যদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের আস্থাভাজন মর্মে রাষ্ট্রপতির কাছে যিনি প্রতীয়মান হন, রাষ্ট্রপতি তাকে প্রধানমন্ত্রী পদে নিয়োগ দেন। এরূপ নিয়োগের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির একক সিদ্ধান্তে নিয়োগকার্যটি সমাধার জন্য তিনি সাংবিধানিকভাবে ক্ষমতাপ্রাপ্ত হলেও তার পক্ষে স্বীয় ইচ্ছায় সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যদের আস্থাভাজন নয়- এমন কোনো সংসদ সদস্যকে প্রধানমন্ত্রী পদে নিয়োগ দেয়ার সুযোগ নেই।

বিগত শতকের ’৯০-এর দশক থেকে অদ্যাবধি বাংলাদেশের বড় দুটি দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপি রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পালন করে আসছে। উভয় দল থেকে যে দু’জন প্রধানমন্ত্রী পদে আসীন হন তারা উভয়ে নিজ নিজ দলেরও প্রধান। উভয়ে রাষ্ট্রপতি নিয়োগের ক্ষেত্রে দলীয় সংসদ সদস্য বা দলীয় মতাদর্শীর বাইরে অপর কাউকে বিবেচনায় নেননি। সরকার ও দলীয়প্রধান একই ব্যক্তি হলে দল ও সরকারের সব গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত তার আকাক্সক্ষার আলোকে বাস্তবায়িত হয়। সুতরাং যিনি প্রধানমন্ত্রীর আকাক্সক্ষায় রাষ্ট্রপতি পদে আসীন, প্রধান বিচারপতি নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর সন্তুষ্টির কথা চেতন বা অবচেতনভাবে তার চিন্তায় প্রবেশ করলেও করতে পারে।একজন কর্মরত প্রধান বিচারপতির বয়স ৬৭ বছর পূর্ণ হলে অথবা পদে বহাল থাকাকালীন তিনি মারা গেলে অথবা তিনি প্রধান বিচারপতির পদ থেকে পদত্যাগ করলে পদটি শূন্য হয়। প্রধান বিচারপতির পদ শূন্য হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে এ পদটি পূরণ জরুরি হয়ে পড়ে। ইতিপূর্বে প্রধান বিচারপতির পদ শূন্য হওয়ায় অধিকাংশ ক্ষেত্রে আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠতম বিচারককে নিয়োগ দেয়া হয়েছে, যদিও সংবিধান এ বিষয়ে নিশ্চুপ।

অসুস্থতা বা বিদেশ ভ্রমণজনিত কারণে প্রধান বিচারপতি সাময়িক তার দায়িত্ব পালনে অসমর্থ হলে রাষ্ট্রপতি আপিল বিভাগে কর্মে প্রবীণতম বিচারককে প্রধান বিচারপতি স্বীয় কার্যভার পুনরায় গ্রহণ না করা পর্যন্ত অনুরূপ কার্যভার পালনের দায়িত্ব প্রদান করেন। এক্ষেত্রে সংবিধানে সুস্পষ্টরূপে উল্লেখ রয়েছে, আপিল বিভাগে কর্মে প্রবীণতম ব্যক্তি অনুরূপ দায়িত্ব পালন করবেন; কিন্তু পূর্ববর্তী অনুচ্ছেদে বর্ণিত অবস্থায় প্রধান বিচারপতির পদ শূন্য হওয়ার ক্ষেত্রে সংবিধানে কোনো নির্দেশনা না থাকায় দেশবাসী একাধিকবার জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘনের ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছে। এরূপ নির্দেশনার অনুপস্থিতিতে সুপ্রিমকোর্টের বিচারক হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার যোগ্যতাসম্পন্ন এমন কোনো ব্যক্তি যিনি সুপ্রিমকোর্টের বিচারক পদে আসীন নন, তাকে প্রধান বিচারপতি পদে নিয়োগ অথবা আপিল বিভাগের বিচারক পদে নিয়োগ সাংবিধানিকভাবে বারিত নয়।

রাষ্ট্রপতি কর্তৃক নিয়োগ-পরবর্তী প্রধান বিচারপতির শপথকার্য রাষ্ট্রপতি পরিচালনা করেন; অপরদিকে রাষ্ট্রপতি কর্তৃক নিয়োগ-পরবর্তী আপিল বিভাগ ও হাইকোর্ট বিভাগের বিচারকদের শপথকার্য প্রধান বিচারপতি পরিচালনা করেন। উভয় বিষয়ে সংবিধানের নির্দেশনা সুস্পষ্ট। রাষ্ট্রপতি কর্তৃক একজন ব্যক্তিকে প্রধান বিচারপতি অথবা আপিল বা হাইকোর্ট বিভাগের বিচারক পদে নিয়োগ-পরবর্তী যতক্ষণ পর্যন্ত তিনি শপথবাক্য পাঠ না করেন, ততক্ষণ পর্যন্ত তিনি স্বীয় পদে আসীন হন না। অসুস্থতা ও বিদেশ ভ্রমণজনিত কারণে প্রধান বিচারপতির সাময়িক অনুপস্থিতির জন্য আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠতম বিচারককে অনুরূপ দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে তার শপথ গ্রহণের আবশ্যকতা না থাকায় অনুরূপ দায়িত্ব পালনকালীন তার পক্ষে প্রধান বিচারপতি হিসেবে শপথ অনুষ্ঠান পরিচালনার সুযোগ নেই। সুতরাং প্রধান বিচারপতি পদে আসীন হতে হলে রাষ্ট্রপতি কর্তৃক নিয়োগ-পরবর্তী অবশ্যই তাকে রাষ্ট্রপতি পরিচালিত শপথবাক্য পাঠ করতে হবে এবং তৎপরবর্তী তিনি সাংবিধানিকভাবে যেসব শপথ অনুষ্ঠান পরিচালনার জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত, সেসব শপথ অনুষ্ঠান পরিচালনা করতে পারেন। এ বিষয়ে বিশ্বব্যাপী যে সাংবিধানিক রীতি অনুসৃত হয় তা হল- সাংবিধানিক পদে দায়িত্ব পালনের জন্য যার নিজের শপথ নেই, তিনি অপর সাংবিধানিক পদে নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তির শপথ অনুষ্ঠান পরিচালনা করতে পারেন না।

উচ্চ আদালতের একজন বিচারক নিয়োগ-পরবর্তী তার বয়স ৬৭ বছর পূর্ণ হওয়া অবধি পদে বহাল থাকেন; তবে প্রধান বিচারপতিসহ উভয় বিভাগের যে কোনো বিচারক চাইলে রাষ্ট্রপতির উদ্দেশে লিখিত স্বীয় স্বাক্ষরযুক্ত পত্রযোগে পদত্যাগ করতে পারেন। বাংলাদেশে সদ্য পদত্যাগী প্রধান বিচারপতি ব্যতীত অপর কোনো প্রধান বিচারপতির পদত্যাগের নজির নেই। ইতিপূর্বে আপিল বিভাগের জনৈক বিচারক তাকে অতিক্রান্ত করার কারণে পদত্যাগ করেছিলেন। হাইকোর্ট বিভাগের জনৈক বিচারকের আইন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রিত্ব গ্রহণের জন্য পদত্যাগের নজির রয়েছে। হাইকোর্ট বিভাগের অপর একজন বিচারক সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় রাষ্ট্রপতি কর্তৃক পদত্যাগের জন্য অনুরুদ্ধ হলে তিনি পদত্যাগ করে পদ থেকে সরে দাঁড়ান। তাছাড়া হাইকোর্ট বিভাগের অন্যূন দু’জন বিচারক সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল কর্তৃক অভিযুক্ত হয়ে চাকরি হারানোর পূর্বক্ষণে পদত্যাগ করে বিব্রতকর পরিস্থিতি এড়ানোর প্রয়াস নিয়েছিলেন।

সদ্য পদত্যাগী প্রধান বিচারপতি ব্যতীত ইতিপূর্বে উচ্চ আদালতের যেসব বিচারক পদত্যাগ করেছিলেন, তারা সবাই রাষ্ট্রপতির উদ্দেশে তাদের নিজ নিজ স্বাক্ষরযুক্ত পদত্যাগপত্র সুপ্রিমকোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেলের (রেজিস্ট্রার) কার্যালয়ের মাধ্যমে প্রেরণ করেছিলেন। পদত্যাগপত্রগুলো রাষ্ট্রপতি বরাবর লিখিত হলেও রেজিস্ট্রার জেনারেলের কার্যালয় এগুলো আইন ও বিচার মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করে থাকে। আইন মন্ত্রণালয় প্রয়োজনীয় সারসংক্ষেপ প্রস্তুত করে তা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে প্রেরণ করে এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে তার পরামর্শ সহকারে তা রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ে প্রেরণ করা হয়।প্রধান বিচারপতি ব্যতীত সুপ্রিমকোর্টের উভয় বিভাগের অপরাপর বিচারকদের নিয়োগের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ গ্রহণের আবশ্যকতা রয়েছে। আর তাই প্রধান বিচারপতি ব্যতীত উভয় বিভাগের অপর যে কোনো বিচারক পদত্যাগ করলে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ ব্যতিরেকে রাষ্ট্রপতির পক্ষে তা গ্রহণ করার অবকাশ নেই।

ইকতেদার আহমেদ : সাবেক জজ; সংবিধান, রাজনীতি ও অর্থনীতি বিশ্লেষক
iktederahmed@yahoo.com

jugantor

মন্তব্য

আপনার ইমেইল গোপন থাকবে - আপনার নাম এবং ইমেইল দিয়ে মন্তব্য করুন, মন্তব্যের জন্য ওয়েবসাইট আবশ্যক নয়

*

Open

Close