Home » মতামত » সিনহার ছুটিতে যাওয়ার নেপথ্যের ঘটনা ও রাজনৈতিক তাৎপর্য

সিনহার ছুটিতে যাওয়ার নেপথ্যের ঘটনা ও রাজনৈতিক তাৎপর্য

মি. সিনহা ছুটিতে যাওয়ার পরে বিষয়টি নিয়ে বিএনপি একটি রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার চেষ্টা করছে। তারা নানানভাবে বলার চেষ্টা করছে সরকার সিনহাকে জোর করে ছুটিতে পাঠিয়েছে। সম্প্রতি একটি অনুষ্ঠানে বিএনপি-জামায়াত সমর্থক কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তির সঙ্গে দেখা হয়। তাদেরও কথাবার্তা শুনে মনে হলো এ নিয়ে জামায়াত-বিএনপি ও তাদের সমর্থকরা বেশ ভাল একটি নাটিকা রচনা করেছে।

জামায়াত ও বিএনপি রচিত ওই নাটিকায় সর্বশেষ যোগ হয়েছে সিনহার ঢাকেশ্বরী মন্দিরে লক্ষ্মী পূজা দেয়া ও ঢাকেশ্বরী মন্দিরের অফিস কক্ষে সুব্রত চৌধুরী ও রানা দাশগুপ্তের সঙ্গে গোপন বৈঠক। বিএনপি সমর্থিত সুপ্রীমকোর্ট আইনজীবী সমিতির জেনারেল সেক্রেটারি জনাব মাহবুব উদ্দিন খোকন যুগান্তরকে দেয়া সাক্ষাতকারে বলেছেন, তিনি সুব্রত চৌধুরী ও রানা দাশগুপ্তের সঙ্গে দেখা করেছেন। মি. চৌধুরী তাকে জানিয়েছেন, মি. সিনহা অসুস্থ নন। আর রানা দাশগুপ্ত বলেছেন, মি. সিনহাকে দেখে তার অসুস্থ মনে হয়নি।

সিনহার ঘরের লক্ষ্মী পূজা ঢাকেশ্বরী মন্দিরে দিতে যাওয়া এবং ২৫ মিনিটের বাইশ মিনিট মি. সুব্রত চৌধুরী ও রানা দাশগুপ্তের সঙ্গে রুদ্ধদ্বার বৈঠক করার একটি উদ্দেশ্য যে মি. খোকনের মুখে এই কথা তুলে দেয়া সেটা এখন স্পষ্ট। রানা দাশগুপ্ত ও সুব্রত চৌধুরীর মি. খোকনের সঙ্গে এই সাক্ষাতকার দেয়ার পরে বাংলাদেশের বেশ কয়েকজন প্রতিষ্ঠিত হিন্দু সম্প্রদায়ের ব্যবসায়ী ও সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি আমাকে ফোন করেছেন, এমনকি কয়েকজন অফিসে এসে বলেছেন, আমি যেন লিখি, রানা দাশগুপ্ত ও সুব্রত চৌধুরী ঢাকেশ্বরী মন্দিরকে এসব কাজে ব্যবহারের চেষ্টা যেন আর না করেন। তাঁদের বক্তব্য হলো, মি. সিনহার একান্ত সুহৃদ আবদুল গাফ্্ফার চৌধুরী যেখানে লিখেছেন যে, সিনহা জুডিশিয়াল ক্যু করে শেখ হাসিনার সরকার পতনের ষড়যন্ত্রে পা দিয়েছিলেন। তারপরেও তাকে নিয়ে আর যাই হোক পবিত্র মন্দির ব্যবহার করা উচিত নয়। আমি তাদের বলেছি, বিষয়টি নিয়ে আপনারা মন্দির কর্তৃপক্ষকে বলুন। এ নিয়ে আমার কিছু লেখার নেই।

যা হোক, এখানে সুব্রত চৌধুরী ও রানা দাশগুপ্ত কোন বিষয় নয়। তারা কেবলমাত্র জামায়াত ও বিএনপি দ্বারা ব্যবহৃত হয়েছেন। বাংলাদেশে আওয়ামী লীগবিরোধী অবস্থানে গেলে একটা পর্যায়ে জামায়াত ও বিএনপির সঙ্গে যেতে হয়। এটাই বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক অবস্থানের ভবিতব্য। তবে সুব্রত চৌধুরী ও রানা দাশগুপ্ত এখানে না বুঝে অনেক ক্ষতি করেছেন মি. সিনহার। কারণ, প্রধান বিচারপতি নিজের ছুটি সব সময় নিজে নেন। শুধু রাষ্ট্রপতিকে অবহিত করতে হয়। তিনি অসুস্থ একথা বলে সেটাই করেছিলেন। কিন্তু তাকে নিয়ে জামায়াত ও বিএনপি এই রাজনীতি করাতে যে তিনি অসুস্থ নন, তাকে অসুস্থ বানানো হয়েছে আর রানা দাশগুপ্ত ও সুব্রত চৌধুরী শুঁড়ির সাক্ষী হওয়াতে সিনহা আরও বেশি মুশকিলে পড়েছেন।

বাস্তবে অনেকের কাছে মনে হয়েছে ওই দিন সকালে সিনহা হঠাৎ ছুটির সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বা কারো চাপে ছুটির সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। প্রকৃত তথ্য অনুসন্ধান করে যা জানা যায় তাতে ঘটনা সম্পূর্ণ ভিন্ন। সিনহা তার আগের দিন অর্থাৎ ১ অক্টোবরই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, তিনি হয় পদত্যাগ করবেন না হয় ছুটিতে যাবেন। আর সিনহার এই সিদ্ধান্তের সঙ্গে সরকারের কোন সম্পর্ক নেই। বরং ১ অক্টোবর সিনহা ও আপীল বিভাগের অন্য বিচারপতিদের ভিতর যে ঘটনা ঘটেছিল তা থেকে নিজের মুখ রক্ষা করার জন্য সিনহা শেষ পর্যন্ত ওই ছুটিতে গেছেন। ১ তারিখ আপীল বিভাগের বিচাপতিদের সঙ্গে সিনহার কী ঘটেছিল সে সম্পর্কে অনুসন্ধান করতে গিয়ে যা পেয়েছি তা নিম্নরূপ।

৩০ তারিখ সিনহা ছাড়া আপীল বিভাগের অন্য বিচারপতিদের একটি মিটিং হয়। ওই মিটিংয়ে তাঁরা সিনহার মানি লন্ডারিং, আয়ের সঙ্গে ইনকাম ট্যাক্সের অসঙ্গতি, স্যালারি এ্যাকাউন্টে চার কোটি টাকা জমা ও কাশ আউট হওয়াসহ যে সব দুর্নীতির খবর পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে এগুলো যাচাই করেন। তাছাড়া তাঁদের নিজস্ব বা অন্য কোন অনুসন্ধানের মাধ্যমে পাওয়া মি. সিনহার আরো কিছু মানি লন্ডারিংসহ বেশ কিছু দুর্নীতির সুনির্দিষ্ট তথ্য পান। যতদূর জানা যায়, এগারোটি দুর্নীতি আপীল বিভাগের বিচারকদের কাছে দ-নীয় দুর্নীতি হিসেবে প্রমাণিত হয়। তখন ওই বিচারকগণ নিজেদের ভেতর আলোচনা করেন, বিচারক হিসেবে তাঁরা আর এমন একজন দুর্নীতিগ্রস্তের সঙ্গে বিচারকের আসনে বসবেন কিনা? তাঁরা এ সিদ্ধান্তে আসেন, আইনগতভাবে ও নৈতিকভাবে কোনদিক থেকেই তাঁরা আর সিনহার সঙ্গে বিচারকের আসনে বসতে পারেন না। তখন তাঁরা বিষয়টি নিয়ে আবারও বসার সিদ্ধান্ত নেন।

১ তারিখ সকালে সম্ভবত ১০টা বা ১১টার দিকে আপীল বিভাগের মাননীয় বিচারকরা আবার বৈঠকে বসেন। ওই বৈঠকে তাঁরা সিদ্ধান্ত নেন একজন বিচারক হিসেবে, একজন ভদ্রঘরের সন্তান হিসেবে তাঁরা কোনমতেই একজন সুনির্দিষ্ট দুর্নীতিগ্রস্তের সঙ্গে বিচারকের আসনে বসতে পারেন না। তাছাড়া এটা তাদের শপথেরও অংশ। তখন তাঁরা সিদ্ধান্ত নেন, আপীল বিভাগের সিনিয়রমোস্ট বিচারপতি জনাব আবদুল ওয়াহ্্হাব মিঞার নেতৃত্বে তাঁরা মি. সিনহার সঙ্গে দেখা করবেন এবং তাকে জানিয়ে দেবেন তাঁরা আর তাঁর সঙ্গে বিচারকের আসনে বসবেন না। পরে তাঁরা বিষয়টি মহামান্য রাষ্ট্রপতিকে অবহিত করবেন। এই সিদ্ধান্ত গ্রহণের পরে তাঁরা মি. সিনহার সঙ্গে দেখা করার জন্যে সিনহার প্রাইভেট সেক্রেটারিকে ফোন করেন। কিন্তু বারবার ফোন করার পরেও সে ফোন ধরে না। একটি সূত্র জানায়, আপীল বিভাগের এই বৈঠকের খবর সিনহা ইতোমধ্যে পেয়ে যান বলেই তিনি তার প্রাইভেট সেক্রেটারিকে বলে রেখেছিলেন, সে যেন আপীল বিভাগের কোন বিচারপতির ফোন না ধরে। যা হোক, অনেক চেষ্টার পরেও তাকে ফোনে না পেয়ে আপীল বিভাগের মাননীয় বিচারপতিগণ তখন সুপ্রীমকোর্টের রেজিস্ট্র্রার জেনারেলকে ফোন করেন এবং সিনহার সঙ্গে অ্যাপয়নমেন্টের জন্যে বলেন। তখন মি. সিনহা তাঁদের বিকেল পাঁচটায় সময় দেন। এই সময় দেয়ার পর মুহূর্তেই মি. সিনহা মোবাইলে আপীল বিভাগের মাননীয় একজন বিচারককে ফোন করেন ও তাঁকে তার কাছে যেতে বলেন। তিনি তখন উত্তর দেন, আমরা সকলে এক জায়গায় আছি এবং আমরা আমাদের সিনিয়রমোস্ট বিচারপতির নেতৃত্বে আপনার সঙ্গে দেখা করতে চাই। সে সময়ে মি. সিনহা বিচারপতি ওয়াহ্্হাব মিঞায় সঙ্গে কথা বলেন। তখন বিচারপতি ওয়াহ্্হাব মিঞা সিনহাকে জানান আমরা আপনার সঙ্গে জরুরী দেখা করতে চাই। মি. সিনহা তখন তাঁদের বলেন, তাহলে আপনারা এখনই আসুন।

এর পরে আপীল বিভাগের মাননীয় বিচারপতিগণ বিচারপতি ওয়াহ্্হাব মিঞার নেতৃত্বে তার বাসায় যান এবং তাঁরা তার দুর্নীতির বিষয়গুলো একটি কাগজে লিখে নিয়ে যান। সিনহার বাসায় পৌঁছে আপীল বিভাগের অন্য বিচারপতিদের পক্ষ থেকে বিচারপতি জনাব ওয়াহ্্হাব মিঞা জানান, তাঁদের কাছে মি. সিনহার এই সকল দুর্নীতির সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পৌঁছেছে। তাছাড়া পত্রপত্রিকায় ও টেলিভিশনে ইতোমধ্যে বেশ কিছু প্রকাশ হয়েছে। এছাড়াও তাকে ঘিরে কিছু লজ্জাকর ডকুমেন্ট আছে, সেগুলো নিয়ে তিনি আর কথা বলতে চান না। এর পরে বিচারপতি জনাব ওয়াহ্্হাব মিঞা বলেন, এসব কিছুর পরে তাঁদের অর্থাৎ আপীল বিভাগের সকলের সিদ্ধান্ত তাঁরা কেউ আর তার সঙ্গে বিচারকের আসনে বসবেন না। তাঁদের এ কথার পরে সিনহা বলেন, তাহলে তো আমার পদত্যাগ করা ছাড়া কোন উপায় থাকে না। তাহলে আমি পদত্যাগ করি। তখন একজন মাননীয় বিচারপতি বলেন, হ্যাঁ, আপনি এক্ষুণি পদত্যাগ করেন। তখন সিনহা তাঁদের জানান, তিনি হয় পদত্যাগ করবেন না হয় ছুটিতে যাবেন। এই বলে সিনহা তাঁদের তার সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেন এবং সিনিয়রমোস্ট বিচারপতি ওয়াহ্্হাব মিঞাকে বলেন, যেহেতু তিনি ৩ তারিখের অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছেন, এখন বিচারপতি ওয়াহ্্হাব মিঞা যেন অনুষ্ঠানটি করেন। কারণ, তিনি হয় ছুটিতে যাবেন না হয় পদত্যাগ করবেন।

এর পরের দিন সকালে অফিসে এসে বেলা একটার দিকে মি. সিনহা এক মাসের ছুটিতে যান। যতদূর জানি, প্রধান বিচারপতির কোন বড় ছুটির প্রথম ধাপ এক মাস হয়, পরে সেটা তিনি নিজেই রাষ্ট্রপতিকে অবহিত করে বাড়িয়ে নেন। তাই পদত্যাগ না করে বাকি সময় ছুটি হিসেবে কাটানোর জন্যে সিনহা ছুটি নিয়েছেন। ছুটির কারণ হিসেবে দেখিয়েছেন অসুস্থতা। এভাবে নীরবে সিনহা তার দুর্নীতির হাত থেকে বাঁচতে চাচ্ছিলেন। যদিও আইনকে তার নিজস্ব গতিতেই চলতে দেয়া উচিত। আর সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে যখন আইন নিজস্ব গতিতে চলে, সাবেক রাষ্ট্রপতি এরশাদের ক্ষেত্রেও তাই ঘটেছে, সে ক্ষেত্রে প্রধান বিচারপতি দুর্নীতি করলে তিনি তো আর আইনের উর্ধে থাকতে পারেন না। যাহোক, তারপরেও সিনহা খুবই ধূর্ততার সঙ্গে নীরবে বাঁচার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু বিএনপির মতো বন্ধু থাকলে আর শত্রুর দরকার পড়ে না। সিনহার ক্ষেত্রেও ঘটেছে তাই। এখন সব কিছু টেনে বের করার কাজটি বিএনপিই উসকে দিচ্ছে। তার ওপর সিনহার রয়েছে দুই নন্দী-ভৃঙ্গী- সুব্রত ও রানা।

swadeshroy@gmail.com

মন্তব্য

আপনার ইমেইল গোপন থাকবে - আপনার নাম এবং ইমেইল দিয়ে মন্তব্য করুন, মন্তব্যের জন্য ওয়েবসাইট আবশ্যক নয়

*

Open

Close