ব্রেকিং:
Warning: mysql_query(): Unable to save result set in /home/dnn/public_html/wp-includes/wp-db.php on line 1889
Home » মতামত » সুপ্রিম কোর্টের ঐতিহাসিক রায়ে ভয়াবহ সংকটের মুখোমুখি সরকার -ড. তুহিন মালিক

সুপ্রিম কোর্টের ঐতিহাসিক রায়ে ভয়াবহ সংকটের মুখোমুখি সরকার -ড. তুহিন মালিক

মঙ্গলবার প্রকাশিত হয়েছে ষোড়শ সংশোধনী অবৈধ ঘোষণার পূর্ণাঙ্গ রায়। প্রধান বিচারপতি তাঁর পর্যবেক্ষণে “যত্রতত্র ক্ষমতার অপব্যবহারে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের বদলে ক্ষমতাধর দৈত্যে রুপান্তর, নিরপেক্ষ ও হস্তক্ষেপমুক্ত নির্বাচনের অভাবে অবিকশিত গণতন্ত্র, ঝুঁকিপূর্ন মানবাধিকার, অনিয়ন্ত্রিত দুর্নীতি, অকার্যকর সংসদ, প্রশাসনে বিশৃঙ্খলা, ক্ষমতার অপব্যবহার, নির্বাহী বিভাগের অসহিষ্ণু ও বেপরোয়া, বিচার বিভাগের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ”সহ বিভিন্ন বিষয়ে সরকারের স্বরুপ তুলে ধরেছেন।

ক্ষমতাসীন হবার পর থেকে আওয়ামী লীগ অধিকাংশ ক্ষেত্রে আদালতের সেসব সিদ্ধান্ত ও পর্যবেক্ষণ তাদের পছন্দ হয়েছে, সেগুলোকে সানন্দে বরণ করতে দেখা গেছে। নিজেদের স্বার্থে কখনও তারা সংবিধানের দোহাই দিয়েছে। কখনও আবার আদালতের দোহাই দিয়ে কার্যসিদ্ধি করেছে। তত্বাবধায়ক সরকার বাতিল করতে গিয়ে বিচারপতি খায়রুল হকের ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিলের রায় ও পর্যবেক্ষণকে তারা তাদের স্বপক্ষে বড় যুক্তি হিসাবে দেখিয়েছিল।
এবার ষোড়শ সংশোধনী অবৈধ ঘোষণার পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের পর আওয়ামী লীগের সেই নেতারা নিশ্চিতভাবেই গলা ফাটিয়ে বলবেন যে, ‘আদালতের পর্যবেক্ষণের কোনো কার্যকারিতা নেই।’
কিন্তু সর্বোচ্চ আদালত হিসাবে সুপ্রিম কোর্টের ‘অবিটার ডিকটা’ মানার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। হাইকোর্টের অবিটার ঐচ্ছিক হলেও, যেহেতু হাইকোর্টের অবিটারকে আপিল বিভাগ সমুন্নত রেখেছে, সেহেতু আপিল বিভাগের অবিটার ডিকটা মানার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
কেননা, ২০১৩ সালের ১৮ জুলাই ভারতের প্রধান বিচারপতি আলতামাশ কবীরের নেতৃত্বাধীন পাঁচ সদস্যের সুপ্রিম কোর্ট বেঞ্চ মত দেন, ‘বিচারপতি বি পি সিনহার নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের সুপ্রিম কোর্ট বেঞ্চ এর আগে (২০ মার্চ, ১৯৫৯) বলেছিলেন, সুপ্রিম কোর্টের অবিটার ডিকটা বা পর্যবেক্ষণের উল্লেখযোগ্য গুরুত্ব দিতে হবে। আমরা আজও তা সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করি। সংবিধানের ১৪১ অনুচ্ছেদের (আমাদের ১১১) আওতায় সুপ্রিম কোর্টের দেওয়া অবিটার ডিকটা মানার আইনগত বাধ্যবাধকতা আছে।’
মঙ্গলবারের প্রকাশিত পূর্নাঙ্গ রায়ে আপিল বিভাগের পুরো সাতজন বিচারপতিই একমত পোষণ করেছেন।
সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ একযোগে পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন যে ‘১৯৭৫ সালের চতুর্থ সংশোধনী ছিল সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর পরিপন্থী’।
প্রধান বিচারপতি বলেছেন, ‘সংসদের উচিত নয় সুপ্রিমকোর্টের কোনো পর্যবেক্ষণ সম্পর্কে কোনো মন্তব্য বা কটাক্ষ করা।’

তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিষয়ক ত্রয়োদশ সংশোধনীর বিষয়ে প্রধান বিচারপতি বলেছেন, ‘সংখ্যাগরিষ্ঠের রায়ে আপিল বিভাগ মত দিয়েছিলেন যে, দুটি সংসদীয় নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে হতে পারে। তবে শর্ত হল, বিলুপ্ত হওয়া ৫৮(ক) অনুচ্ছেদের ৩ ও ৪ দফা অনুযায়ী সর্বশেষ অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি কিংবা আপিল বিভাগের সর্বশেষ অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিকে প্রধান উপদেষ্টা পদে নিয়োগ করা যাবে না। প্রধান বিচারপতির নিয়োগ প্রক্রিয়ায় রাজনীতিকীকরণ হতে পারে, এদিকটি মাথায় রেখে আদালত উল্লিখিত নির্দেশনা দিয়েছিলেন।’
প্রধান বিচারপতি তাঁর পর্যবেক্ষণে বলেছেন- ‘গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের বদলে ক্ষমতাধর দৈত্যে রুপান্তর, রাজনীতির বাণিজ্যিকরণ, ক্ষমতার জোড়ে জনপ্রতিষ্ঠানসমূহ নিয়ন্ত্রণকরণ, ক্ষমতার অপব্যবহারে উৎসাহিত এবং যত্রতত্র ক্ষমতার অপব্যবহারের ধৃষ্টতা প্রদর্শন, অপ্রাতিষ্ঠানিক নির্বাচন কমিশন, জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিরপেক্ষভাবে এবং কোনো হস্তক্ষেপ ছাড়া স্বাধীনভাবে না হতে পারলে গণতন্ত্র বিকশিত হতে পারে না, গ্রহণযোগ্য নির্বাচন ছাড়া গ্রহণযোগ্য সংসদ প্রতিষ্ঠা হয় না, মানবাধিকার ঝুঁকিতে, দুর্নীতি অনিয়ন্ত্রিত, সংসদ অকার্যকর, প্রশাসনে বিশৃঙ্খলা, খারাপ লোকেরা আরও লুটপাটে বেপরোয়া, ক্ষমতার অপব্যবহার ও দাম্ভিকতা দেখানোর ক্ষেত্রে বাধা দেওয়ার মতো কোনো প্রতিষ্ঠান নেই, জনগণের জানমালের নিরাপত্তা ভীষণ রকম ক্ষতিগ্রস্ত, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পরিস্থিতি সামাল দিতে অক্ষম, নির্বাহী বিভাগ আরও অসহিষ্ণু ও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে, আমলাতন্ত্র দক্ষতা অর্জনে চেষ্টাহীন, নির্বাহী বিভাগ দাম্ভিক নিয়ন্ত্রণহীন, নির্বাহী বিভাগ বিচার বিভাগের ক্ষমতা সংকুচিত করতে ধ্বংসাত্মকভাবে আগ্রহী, ৭০ অনুচ্ছেদের জন্য দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে সংসদ সদস্যদের প্রশ্ন তোলার স্বাধীনতা নেই, বিচার বিভাগের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপসহ’ সরকারের স্খলিত রুপ।

নিম্ন আদালতের নিয়ন্ত্রণ রাষ্ট্রপতির হাতে-এ সংক্রান্ত সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদকে অবৈধ বলেছে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহাসহ আপিল বিভাগের আরো দুজন বিচারপতি এই অভিমত দিয়েছেন। ১১৬ অনুচ্ছেদ নিয়ে প্রধান বিচারপতি তার অভিমতে বলেন, “সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে ১১৬ অনুচ্ছেদে সংশোধন আনা হয়। এতে ‘সুপ্রিম কোর্টের’ স্থলে ‘প্রেসিডেন্ট’ শব্দ সন্নিবেশিত হয়। এর মাধ্যমে জুডিশিয়াল সার্ভিসে কর্মরতদের নিয়োগ, বদলি, পদোন্নতির নিয়ন্ত্রণ প্রেসিডেন্টের কাছে ন্যস্ত করা হয়। এই ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষেত্রে যদিও সুপ্রিম কোর্টের সঙ্গে পরামর্শের বিধান রাখা হয়েছে, তথাপি তা অর্থহীন যদি নির্বাহী বিভাগ এক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্টকে সহযোগিতা না করে। আবার ১১৬ অনুচ্ছেদ সংবিধানের ১০৯ অনুচ্ছেদের সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক। যেখানে বলা হয়েছে, অধস্তন সকল আদালত ও ট্রাইব্যুনালের তত্ত্বাবধান ও নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা হাইকোর্ট বিভাগের হাতে থাকবে।” প্রধান বিচারপতি অভিমতে বলেন, ‘আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য অধস্তন আদালতকেও স্বাধীন ও নিরপেক্ষ হতে হবে। বিচার বিভাগ এখন এমন এক বেদনাদায়ক পরিস্থিতির মুখোমুখি যে মাসদার হোসেন মামলার রায়ে নির্দেশনা সত্ত্বেও সংবিধানের ২২ অনুচ্ছেদ কার্যকরে কিছুই করা হচ্ছে না।’
সরকারী দল হয়তো পরিকল্পনা নিয়েছে যে তারা সংসদের আগামী অধিবেশনে এই রায় ও পর্যবেক্ষণকে সংসদের ভিতরে তুলোধুনো করবে। কিন্তু সেটা করা হলে সরকারের অবৈধতার সংকট আরো বেশীমাত্রায় দীপ্তিমান হয়ে উঠবে।

ষোড়শ সংশোধনী অবৈধ ঘোষণার পূর্ণাঙ্গ রায় ও প্রধান বিচারপতির পর্যবেক্ষণ সরকারের বৈধতা ও আচরনের বিষয়ে বড় ধরনের প্রশ্নের অবতারনা করেছে, যা গায়ের জোড়ে দমন করার শক্তি সরকারের নেই।
সূত্র: বাংলামেইল ৭১

মন্তব্য

আপনার ইমেইল গোপন থাকবে - আপনার নাম এবং ইমেইল দিয়ে মন্তব্য করুন, মন্তব্যের জন্য ওয়েবসাইট আবশ্যক নয়

*

Open

Close