সরকারের সঙ্গে আপোসের চেষ্টা বিএনপির

0

সরকারের ঘনিষ্ঠ হতে চাইছে বিএনপি। ৩০ ডিসেম্বর নির্বাচনের আগে বিএনপি ছিল যুদ্ধাংদেহী। বিএনপির অনেক নেতাকর্মী ঘোষণা দিয়েছিল, এই সরকারের মেয়াদ শেষ হবে ৩০ ডিসেম্বর। পয়লা জানুয়ারি খালেদা জিয়া মুক্ত হবেন।

তাদের এমন হুমকি ধামকিতে অনেকেই মনে করেছিল, বিএনপি ক্ষমতায় আসতে না পারুক, দলটি ভালো সংখ্যক আসন নিয়ে সংসদে আসবে এবং একটা উত্তপ্ত রাজনীতি দেশে তৈরী হবে। কিন্তু এসব আশংকায় গুড়ে বালি দিয়ে বিএনপি নির্বাচনে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ব্যানার থেকে মাত্র ৮ টি আসন পেয়েছে।

নির্বাচনে মহা বিপর্যয়ের পর বিএনপি কার্যত স্তব্ধ এবং হতবাক। এর মধ্যে আছে বিএনপির নিজেদের মধ্যে নানা রকম টানাপোড়েন। বিএনপির নেতাকর্মীদের এখন নতুন করে আন্দোলনের জন্য শক্তি এবং সাহস কোনটাই নেই। এরকম পরিস্থিতিতে বিএনপির এখন নতুন কৌশল দৃশ্যমান হচ্ছে।

কৌশলটি হচ্ছে বিএনপি এখন আওয়ামী লীগের সঙ্গে একটা সমঝোতায় আসার চেষ্টা করছে। এই সমঝোতার মাধ্যমে যেন বিএনপি রাজনৈতিক দল হিসেবে স্বাভাবিক হতে পারে। নতুন কর্মসূচী দিয়ে যেন নেতাকর্মীদের হতাশা কাটিয়ে উঠতে পারে, সেটাই বিএনপির লক্ষ্য।

বিএনপি যে সরকারের সঙ্গে আপোসে আসতে চাচ্ছে, অনেকগুলো ঘটনা তার পক্ষে স্পষ্ট ধারনা দিচ্ছে। এর মধ্যে একটি হলো আওয়ামী লীগের সাধারন সম্পাদক ওবায়দুল কাদের অসুস্থ হওয়ার পর বিএনপির শীর্ষ নেতারা ওবায়দুল কাদেরকে দেখতে বঙ্গবন্ধু মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে যান।

তাঁর চিকিৎসার খোঁজখবর নেন। তাঁর দ্রুত রোগ মুক্তির জন্য দোয়া করেন। এই ঘটনার পরদিনই বেগম খালেদা জিয়ার নাইকো দুর্নীতি মামলার বিশেষ আদালতে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়। বিএনপির মহাসচিব একজন দণ্ডিত আসামীর সঙ্গে দীর্ঘক্ষন আলাপ আলোচনা করেন।

ধারণা করা হচ্ছে, এই আলাপ আলোচনাতে বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি এবং রাজনীতিতে বিএনপি যেন টিকে থাকতে পারে সেজন্য সরকারের সঙ্গে একটা সমঝোতার ব্যাপারে খালেদা জিয়ার কাছ থেকে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর পরামর্শ বা মতামত নিয়েছেন।

তৃতীয় যে ঘটনা আমরা লক্ষ্য করলাম, নির্বাচনের পর এই প্রথম স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বিএনপির শীর্ষ পাঁচ নেতা দেখা করলেন এবং তারা বেগম খালেদা জিয়াকে যেন দ্রুত উন্নত চিকিৎসা দেওয়া হয় সেজন্য আবেদন করলেন। অথচ এতদিন ধরে বিএনপির নেতাকর্মীরা বলছে , সভায় সেমিনারে তারা বক্তব্য রাখছিলেন বেগম খালেদা জিয়াকে আন্দোলনের মাধ্যমে মুক্ত করা হবে।

৩০ ডিসেম্বর নির্বাচনের পরে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছিলেন, এই সরকার বৈধ নয়। এই সরকার গ্রহনযোগ্য নয়। এমনকি তাদেরকে দখলদার সরকার হিসেবেও তাদেরকে অবিহিত করেছেন। তাই যদি হবে, একটা দখলদার সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে তিনি বৈঠক করছেন এটা বিএনপির জন্য নিশ্চয়ই একটা আপোস রফারই কৌশল।

বিএনপির দায়িত্বশীল সূত্রগুলো বলছে, বিএনপি নির্বাচনের পরে প্রথমে ভেবেছিলেএকটা বড় ধরনের আন্দোলন করবে এবং আন্দোলনের মাধ্যমে বিএনপি এই সরকারের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তুলবে। কিন্তু আন্দোলন সংগঠিত করার শক্তি বিএনপির নেতাদের যেমন নেই, তেমনি দলীয় কর্মীদেরও আন্দোলনের শক্তি ছিল না।

যে কারণে বিএনপির নেতাকর্মীরা আন্দোলনের বিকল্প ভাবছেন। বিএনপিকে পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল নির্বাচনী ট্রাইবুন্যালে গিয়ে মামলা করার জন্য, নির্বাচনের বৈধতাকে চ্যালেঞ্জ করার জন্য। কিন্তু দেখা গেল যে ৩ শতাধিক আসনের বিপরীতে মাত্র ৭৪ টি আসনের মামলা হয়েছে।

ধরা যাক, নির্বাচনী ট্রাইবুনাল যদি ৭৪ টি আসনেই আওয়ামী লীগের নির্বাচিত প্রার্থীকে অযোগ্য ঘোষণা করে এবং বিএনপি প্রার্থীদের যদি দাবি দাওয়া মেনে নেয়। তাহলেও নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হবে না। কারণ এই ৭৪ টি আসনের ফলাফলও এদিক ওদিক হলেও নির্বাচনের ফলাফলের উপর কোন প্রভাব বিস্তার করবে না।

তাছাড়া তারেক জিয়া এই নির্বাচনী ট্রাইবুন্যালে যেন মামলা করা হয় সেজন্য লন্ডন থেকে সমস্ত নেতাকর্মীদেরই বার্তা দিয়েছিলেন, তারা যেন ট্রাইবুন্যালে মামলা দায়ের করেন। কিন্তু তারেক জিয়ার এই ডাকে সাড়া না দিয়ে মাত্র ৭৪ জন মামলা করেছেন। কাজেই আদালতের মাধ্যমে নির্বাচনকে যে প্রশ্নবিদ্ধ করা সেই সুযোগও বিএনপির সামনে এখন নেই।

বিএনপি চেয়েছিল যে আন্তর্জাতিক মহলের কাছে গিয়ে এ নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করবে এবং বিভিন্ন দূতাবাসে গিয়ে নানা রকম দেন দরবার করেছিল। তাদের ভাষায় যে অনিয়ম ও কারচুপির বিভিন্ন তথ্য উপাত্ত তুলে ধরার চেষ্টা করেছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক মহল এসব অভিযোগ অনুযোগের ব্যাপারে তেমন মনোযোগি নন।

দেখা যায় যে, সরকারের জন্য কাজ করার ব্যাপারেই তারা আগ্রহী। বিদেশি দূতাবাসগুলো বিএনপিকে স্পষ্টই জানিয়ে দিয়েছে যে, নির্বাচন একটি অতীত বিষয়। এটা নিয়ে তারা আগ্রহী নন। বরং তারা দেখতে চান, সরকার কতটা সুশাষন,মানবাধিকার এবং আইনের শাষণ প্রতিষ্ঠার জন্য কতটা উদ্যোগি হয়, দুর্নিতী দমনের ক্ষেত্রে কতটা কার্যকরী হয়।

একাধিক কূটনৈতিক সূত্র বলছে যে, সরকারের যে সাম্প্রতিক কর্মকান্ড এগুলোতে আন্তর্জাতিক মহল অত্যন্ত সন্তুষ্ট। ফলে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে সরকারকে বেকায়দায় ফেলার চেষ্টাও বিএনপির ব্যর্থ হয়েচে। এই অবস্থায় অস্তিত্ব সংকটে থাকা এবং দলীয় কোন্দলে ছিন্নভিন্ন বিএনপি শেষ চেষ্টা হিসেবে সরকারের সঙ্গে আপোস ফর্মূলায় যেতে চাচ্ছে,

যেখানে সরকার তাদের দলীয় প্রধান খালেদা জিয়াকে প্যারোলে যেন মুক্তি দেয় এবং তারা যেন সীমিত আকারে রাজনীতি কর্মসূচীতে অংশগ্রহণ করার সুযোগ পায়। কিন্তু সরকারের একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র বলছে, তাদের সঙ্গে সরকারের আপোস বা সমঝোতার কোন প্রশ্নই আসে না। বরং বিএনপির যেকোন রাজনৈতিক কর্মসূচী করার অধিকার আছে রাজনৈতিক দল হিসেবে।

এটার জন্য সরকারের কোন দয়া বা অনুকম্পার দরকার নেই। সরকারের কাছ থেকে বলা হচ্ছে খালেদা জিয়ার মুক্তি সম্পূর্ণ আইনগত বিষয়। এখানে কোন রাজনীতির বিষয় নেই। কাজেই, খালেদা জিয়ার মুক্তি চাইতে গেলে বিএনপিকে সেটা আইনগতভাবেই চাইতে হবে। আইনগতভাবেই এটার মোকাবিলা করতে হবে।banglainsider

Leave A Reply

Your email address will not be published.