বিএনপি পুনর্গঠনে ছয় দফা সুপারিশ

0

দল পুনর্গঠনের জন্য পরিবারতন্ত্রের অবসানসহ ছয়টি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা দেয়া হয়েছে বিএনপিকে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ভারত ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের দূতাবাস উদার গণতান্ত্রিক দল হিসেবে বিএনপির পুনর্গঠনের জন্য এই সুপারিশগুলো দিয়েছে।

কূটনীতিকদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এই সুপারিশগুলো যদি তারা বাস্তবায়ন করে তবেই বিএনপিকে একটি গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হবে। এরপরই বিএনপির বিভিন্ন দাবি-দাওয়া বা অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত বা সহযোগিতা-সহমর্মিতা প্রকাশ করবে।

৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনের বিএনপির ভরাডুবির বিষয়ে এই চারটি দূতাবাসের পক্ষ থেকে একটি যৌথ মূল্যায়ন প্রতিবেদনে এসব কথা বলা হয়েছে।প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নির্বাচনে অনিয়ম-কারচুপি হয়েছে তা নিয়ে কোন সন্দেহ নেই।

কিন্তু যদি কারচুপি না-ও হতো তাহলেও বিএনপির জয়ের কোন সম্ভাবনা ছিল না। বিএনপির ভরাডুবি ছিল সুনিশ্চিত। সেখানে বলা হয়েছে, বিএনপির বর্তমান অবস্থা বাংলাদেশের জন্য উদ্বেগজনক। বাংলাদেশের যদি একটি শক্তিশালী বিরোধী দল না থাকে তাহলে গণতন্ত্র, মানবাধিকার, সুশাসন হুমকির মুখে পড়ে।

গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় জবাবদিহিতা, সরকারের সমালোচনা এবং সরকার ও বিরোধীদলের মধ্যে সমন্বয়ই হলো গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় রক্ষাকবজ। ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনের মধ্য দিয়ে গণতন্ত্রের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে গেছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপির সাংগঠনিক দুর্বলতাসহ অনেক অক্ষমতা রয়েছে। তবে বিএনপির ব্যাপক জনসমর্থন রয়েছে। প্রধান বিরোধী দল হিসেবে বাংলাদেশে বিএনপির বিকল্প কোন দল এখনও হয়নি।

জাতীয় পার্টিসহ অন্য যেসব রাজনৈতিক দল রয়েছে সেগুলোর বিরোধী দল হিসেবে বিকশিত হওয়ার কোন সম্ভাবনা নেই। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতবিরোধী ও আওয়ামী লীগ বিরোধী যে জনগোষ্ঠী রয়েছে, তাদের কাছে প্রথম পছন্দের রাজনৈতিক দল হলো বিএনপি।

বিপুল জনসমর্থন থাকার পরও নেতৃত্বের ভুল এবং সাংগঠনিক অদক্ষতার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। দল হিসেবে বিলীন হওয়ার উপক্রম হচ্ছে। সেটা যদি হয় তাহলে সেটা বাংলাদেশের গণতন্ত্রের জন্য হবে বড় আঘাত। কাজেই এখন বিএনপিকে ঢেলে সাজানো ও রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাসের কোন বিকল্প নেই।

বিএনপিকে পুনর্বিন্যাস ও সাংগঠনিক সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য ছয়টি সুনির্দিষ্ট সুপারিশ করেছে চারটি দূতাবাস। সুপারিশগুলো অনতিবিলম্বে বিএনপির কাছে হস্তান্তর করা হবে বলে জানা গেছে। যে সুপারিশগুলো করা হয়েছে:

১. পরিবারতন্ত্র থেকে বিএনপিকে রক্ষা: বিএনপি মানেই জিয়া পরিবারের নেতৃত্ব মনে করা হয়। জিয়া পরিবারের বাইরে গেলে বিএনপি ধ্বংস হয়ে যাবে বলে আশঙ্কা করা হয়। কিন্তু সে ধারণা মোটেও ঠিক নয়।

বরং জিয়া পরিবারের হাত থেকে বিএনপিকে রক্ষা করে শক্তিশালী কোন নেতৃত্বের মাধ্যমে দলটির পুনর্গঠনের মাধ্যমে সত্যিকারের উদার গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল হিসেবে বিকাশের পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানানো হয়েছে।

২. গঠনতন্ত্রের আমূল সংস্কার: বিএনপির গঠনতন্ত্রে দলের চেয়ারপার্সনকে সর্বময় ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। চেয়ারপার্সন চাইলে দলে যে কোন পরিবর্তন আনতে পারেন। তৃণমূল থেকে শুরু করে স্থায়ী কমিটির যে কাউকে বহিস্কার করতে পারেন।

এরকম স্বেচ্ছাচারী ক্ষমতা একনায়কতন্ত্রের শামিল। এখানে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের ন্যূনতম সুযোগ নেই। তাই গঠনতন্ত্র সংস্কার করে ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করতে হবে এবং দলে যৌথ সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি চালু করতে হবে।

৩. জামাতের সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদ: অবিলম্বে জামাতসহ অন্যান্য দক্ষিণপন্থী, ইসলাম পছন্দ, মৌলবাদী দলের সঙ্গে বিএনপির সম্পর্ক ছিন্ন করতে হবে। যেন দলটি একটি উদার গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল হিসেবে জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়।

৪. সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদমুক্ত বিএনপি: বিএনপির মধ্যে যারা সন্ত্রাসবাদ ও জঙ্গিবাদের সঙ্গে জড়িত আছেন বা যাদের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ আছে তাদেরকে পর্যায়ক্রমে বিএনপি থেকে বহিস্কার করে দলে পরিচ্ছন্ন ভাব নিশ্চিত করতে হবে।

৫. স্বাধীনতাবিরোধী, মৌলবাদীদের বর্জন: বিএনপির মধ্যে যেসব স্বাধীনতাবিরোধী, মৌলবাদী ও দক্ষিণপন্থী ব্যক্তি বা গোষ্ঠী রয়েছে তাদেরকে চিহ্নিত করে তাদের কাছ থেকে বিএনপিকে মুক্ত করতে হবে। একসময় বিএনপিতে তাদের প্রভাব অনেক বেশি ছিল।

তাদের সংখ্যা কমে গেলেও এখনও বিএনপিতে তাদের একটা শক্ত অবস্থান আছে। এরা বিএনপিকে উদার গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল হতে বাধাগ্রস্ত করছে এবং বিএনপিকে মৌলবাদী দলের দিকে ঠেলে দেয়ার চেষ্টা করছে। এই দক্ষিণপন্থী শক্তি থেকে বিএনপিকে মুক্ত করতে হবে।

৬. জনগণের জন্য কর্মসূচি গ্রহণ: জনগণের কল্যাণে, জনগণের জন্য সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে। গত দশ বছরে বিএনপি জনগণের কল্যাণে বা জনগণের স্বার্থে কোন কর্মসূচি গ্রহণ করেনি।

দলীয় নেতাকর্মীদের মুক্তি কিংবা নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিই তাদের আন্দোলনের প্রধান বিষয়বন্তু ছিল। সেখানে জনসম্পৃক্ত কোন কর্মসূচি ছিল না। রাজনীতিতে টিকে থাকতে হলে বিএনপিকে জনসম্পকৃক্ত কর্মসূচি দিতে হবে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

এই সুপারিশগুলো বাস্তবায়ন করা হলে কূটনীতিকমহল বিএনপির সঙ্গে নতুন করে সম্পর্ক গড়বে। বিএনপি যেন একটি রাজনৈতিক দল হিসেবে বিকশিত হতে পারে সেজন্য সরকারের সঙ্গে দেন-দরবার বা আপোষ-রফার উদ্যোগ গ্রহণ করা হতে পারে বলে কূটনৈতিক সূত্রে নিশ্চিত হওয়া গেছে।

এ ব্যাপারে বিএনপির একাধিক নেতার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা বলেন, আমরা আনুষ্ঠানিকভাবে এরকম কোন সুপারিশ পাইনি। আনুষ্ঠানিক সুপারিশ পাওয়ার পরই আমরা বিষয়টি বিবেচনা করে দেখবো।বাংলা ইনসাইডার/এমআর

Leave A Reply

Your email address will not be published.