কি আশ্চর্য: করোনা রোগীদের জন্যসব মিলিয়ে প্রস্তুত মাত্র ২৯ আইসিইউ

0

এ পর্যন্ত ফোনকল এসেছে ৭ লাখের বেশি, পরীক্ষা হয়েছে মাত্র ৯২০ জনের * শুধু সোশ্যাল ডিস্ট্যান্সিং নিশ্চিত করে কোভিড-১৯ নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব নয়, প্রতিটি সাসপেক্টেড কেসকে টেস্ট করতে হবে -বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা * স্বাস্থ্য অধিদফতর পরীক্ষাগার বাড়িয়েছে, তবে অনেক দেরিতে -ডা. এম ইকবাল আর্সলান। করোনাভাইরাস প্রতিরোধে খোদ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সবচেয়ে বেশি জোর দিয়েছে পরীক্ষার ওপর। তারা বিশেষ বার্তা দিয়ে একাধিকবার বিশ্বসমাজকে সাফ জানিয়ে দিয়েছে, এই মহামারী প্রতিরোধে সবার আগে সন্দেহভাজনদের পরীক্ষা করতে হবে। শুধু ঘরে আটকে রেখে এই কঠিন মহামারী প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে না। এ অবস্থায় বিষয়টি নিয়ে আমাদের প্রস্তুতি সম্পর্কে নানা শঙ্কা ব্যক্ত করেছেন দেশের প্রথম সারির কয়েকজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক।

শুক্রবার এ প্রসঙ্গে তারা যুগান্তরকে বলেন, অবশ্যই সবার আগে পরীক্ষার ওপর জোর দিতে হবে। কিন্তু বিষয়টি নিয়ে শুরু থেকে আমাদের কী প্রস্তুতি ছিল এবং এখন পর্যন্ত আমরা কতদূর এগোতে পেরেছি- তার ওপর নির্ভর করছে ভবিষ্যতের সাফল্য। তারা বলেন, এখন পর্যন্ত আমরা বেশি মানুষকে পরীক্ষার আওতায় আনতে পারিনি। ফলে জানা সম্ভব হচ্ছে না- প্রকৃতপক্ষে আমাদের চারপাশে কত লোক এই অদৃশ্য ভাইরাস বহন করে চলেছে।

মূল্যবান সময় কিন্তু ফুরিয়ে যাচ্ছে। আর বিলম্ব না করে দ্রুত বেশিসংখ্যক মানুষকে পরীক্ষার আওতায় আনতে হবে। তাহলে সামাজিক দূরত্ব বজায়ের পদক্ষেপ কাজে আসবে। তা না হলে যদি কোনো কারণে যুক্তরাষ্ট্র, ইতালি কিংবা স্পেনের মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়, সেক্ষেত্রে উদ্ভূত সংকট সামাল দেয়া কঠিন হবে। তারা আরও বলেন, পরিস্থিতি খারাপের দিকে গেলে তখন আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে আসবে। সেটি হল, পর্যাপ্ত সংখ্যায় আইসিইউ সাপোর্ট লাগবে।

সে বিষয়টিও এখন সরকারকে গুরুত্বের সঙ্গে ভাবতে হবে। বেশিসংখ্যক লোককে এই সাপোর্ট দিতে হলে এখনই প্রস্তুতি দরকার। তারা বলেন, এ কথাগুলো নিশ্চয় আতঙ্ক ছড়ানোর জন্য বলা হচ্ছে না। যেহেতু বিশ্বের অনেক উন্নত দেশ করোনা প্রতিরোধে হিমশিম খাচ্ছে এবং প্রতিদিন ভয়াবহতার চিত্র পাল্টাচ্ছে, তাই আমাদের আগেভাগে জোর প্রস্তুতি নেয়া দোষের কিছু নয়।

বিশ্বব্যাপী নভেল করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার পর অনেকে বিদেশ থেকে দেশে এসেছেন বা বিদেশিদের সংস্পর্শে গেছেন। অনেকের শরীরে ভাইরাসের সুস্পষ্ট লক্ষণ রয়েছে। তারা আইইডিসিআর ও স্বাস্থ্য অধিদফতরের নির্দিষ্ট নম্বরে কল করছেন। একাধিকবার কল করেও অনেকে ওইসব নম্বরে ঢুকতে পারছেন না। যারা ফোনের সংযোগ পাচ্ছেন, তাদের বেশির ভাগই পাচ্ছেন না পরীক্ষার সুযোগ।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকার শুধু বাড়িতে ১৪ দিন কোয়ারেন্টিনে থাকতে বলছে। সন্দেহজনক সব মানুষকে পরীক্ষার আওতায় আনা সম্ভব হচ্ছে না। বিশ্বব্যাপী ভাইরাসটি ছড়িয়ে পড়ার প্রায় ৩ মাস পরও দেশে এমন পরিস্থিতি বিরাজ করছে। যদিও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বারবার গুরুত্ব দিয়ে বলেছে, করোনা নিয়ন্ত্রণে পরীক্ষার কোনো বিকল্প নেই। ২১ জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত করোনাভাইরাস সংক্রান্ত সেবা পেতে অধিদফতর ও আইইডিসিআরের ফোনগুলোতে কল এসেছে ৭ লাখ ২৯ হাজার ৪৪৬টি।

তথ্যটি স্বাস্থ্য অধিদফতরের সমন্বিত কন্ট্রোল রুমের। সেখান থেকে আরও জানা গেছে, ২১ জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত আকাশ, সড়ক ও সমুদ্রপথে ৬ লাখ ৬৪ হাজার ৬০৩ জন দেশে প্রবেশ করেছে। সব যোগাযোগ ব্যবস্থা এক প্রকার বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরও গত ২৪ ঘণ্টায় দেশে প্রবেশ করেছে ৪৪৬ জন। যারা প্রত্যেকেই করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়েছে এমন দেশ থেকেই এসেছেন। এরা প্রত্যেকেই থেকে গেছেন পরীক্ষার বাইরে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা প্রদত্ত নির্দেশিকা অনুযায়ী, কোভিড-১৯ রোগের ভাইরাস শনাক্ত করার জন্য বায়োসেফটি লেভেল-২ কিংবা তার সমমানের ল্যাবরেটরি প্রয়োজন হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা স্পষ্ট করে বলেছে, শুধু লকডাউনের মাধ্যমে সোশ্যাল ডিস্ট্যান্সিং নিশ্চিত করে কোভিড-১৯ এর মহামারী নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব নয়। প্রতিটি সাসপেক্টেড কেসকে টেস্ট করতে হবে। পজিটিভ কেসগুলো আইসোলেট করতে হবে। কন্ট্যাক্ট ট্রেসিং করে বাকিদের কোয়ারেন্টিনে আনতে হবে। মুমূর্ষু রোগীদের ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট (আইসিইউ) সেবা নিশ্চিত করতে হবে। তাহলেই প্যানডেমিক (মহামারী) নিয়ন্ত্রণে আসবে।

এ প্রসঙ্গে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণরসায়ন বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. এম ইকবাল আর্সলান বলেন, ইতোমধ্যে দেশে কমিউনিটি ট্রান্সমিশন শুরু হয়েছে। আইইডিসিআরও বিষয়টি শিকার করে নিয়েছে। এক্ষেত্রে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা অনুসারে পরীক্ষা, পরীক্ষা এবং পরীক্ষা এই নীতিমালা অনুসরণ করতে হবে। তিনি বলেন, স্বাস্থ্য অধিদফতর ইতোমধ্যে পরীক্ষাগার সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে। তবে অনেক দেরিতে। এই কাজটি আরও অনেক আগেই করা উচিত ছিল।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্য মতে, সম্প্রতি নভেল করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীদের জন্য রাজধানীর দুটি ইতোমধ্যে ২৯টি আইসিইউ শয্যা প্রস্তুত রাখা হয়েছে। দেশের বিভিন্ন সরকারি বিশেষায়িত হাসপাতাল, মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, জেলা হাসপাতাল পর্যায়ে আইসিইউ সেবার ব্যবস্থা রয়েছে। সরকারি ৩৪টি হাসপাতালে মোট আইসিইউ বেডের সংখ্যা ২৮৬টি। বেসরকারি ক্লিনিক ও হাসপাতালে বর্তমানে কতগুলো আইসিইউ চালু আছে তার কোনো পরিসংখ্যান সরকারের স্বাস্থ্য অধিদফতরে নেই। তবে বর্তমানে ৭০টির বেশি প্রতিষ্ঠানে আইসিইউ সিসিইউ সেবা আছে। এর মধ্যে শুধু রাজধানীর এ্যাপোলা হাসপাতালে আইসিইউ শয্যা রয়েছে ১১১টি।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশে এই মুহূর্তে বেশকিছু ল্যাবরেটরি রয়েছে যেগুলোর এ ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার সক্ষমতা রয়েছে। অর্থাৎ এই ল্যাবরেটরিগুলো বায়োসেফটি লেভেল-২ মানের। এগুলো হল- ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ডায়েরিয়াল ডিজিজ রিসার্চ, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআর,বি), বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অব ট্রপিক্যাল অ্যান্ড ইনফেকসাস ডিজিজ (বিআইটিআইড), চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি অ্যান্ড অ্যানিমাল সায়েন্স ইউনিভার্সিটি (সিভিএএসইউ), বাংলাদেশ কাউন্সিল অব সায়েন্টিফিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিসার্চ (বিসিএসআইআর), বাংলাদেশ লাইভস্টক রিসার্চ ইন্সটিটিউট (বিএলআরসি) এবং সেন্টার ফর অ্যাডভান্স রিসার্চ ইন সায়েন্স (সিএআরএস)।

এছাড়া বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইরালজি বিভাগের ল্যাব, ঢাকা মেডিকেল কলেজের মলিকুলার ল্যাব, ঔষধ প্রশাসন অধিদফতরের মলিকুলার ল্যাব, ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অব প্রিভেন্টিভ অ্যান্ড সোশ্যাল মেডিসিনের (নিপসম) ল্যাবে এ ধরনের পরীক্ষা করা সম্ভব। পাশাপাশি বেশ কিছু বেসরকারি হাসপাতাল এবং ডায়াগনস্টিক সেন্টারে মলিকুলার ল্যাবরেটরি আছে, যেগুলোকে স্বল্প সময়ে, মডিফিকেশন করে বায়োসেফটি লেভেল-২ মানের ল্যাবরেটরিতে রূপান্তরিত করা সম্ভব। এগুলো করোনাভাইরাস শনাক্তকরণ সম্পৃক্ত হলে সন্দেহজনক সবাইকে পরীক্ষার আওতায় আনা সম্ভব হবে। সম্প্রতি স্বাস্থ্য অধিদফতরের পক্ষ থেকেও বলা হয়েছে, ৮ প্রতিষ্ঠানে করোনাভাইরাস পরীক্ষা করার যন্ত্র পিসিআর মেশিন বসানো হচ্ছে, পর্যাপ্ত পরিমাণ কিটও চলে আসছে।

শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের ভাইরোলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. জাহিদুর রহমান বলেন, রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইন্সটিটিউট (আইইডিসিআর) কোভিড-১৯ রোগের মহামারী শুরুর পর থেকে গণমাধ্যমে একের পর এক মিথ্যা তথ্য প্রদান করে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করে আসছে। কিন্তু সত্যটা হল, ঢাকা ও চট্টগ্রামে মিলিয়ে ১০টি প্রতিষ্ঠানে করোনাভাইরাস পরীক্ষার সক্ষমতা রয়েছে। অথচ আইইডিসিআর বলছে, করোনাভাইরাস শনাক্ত করতে যে মানের ল্যাবরেটরি (পরীক্ষাগার) প্রয়োজন বায়োসেফটি লেভেল-৩ মানের ল্যাব বাংলাদেশে শুধু তাদেরই আছে। সুতরাং সব পরীক্ষা সেখানেই করতে হবে। যদিও ২৬ মার্চ প্রথমবারের মতো প্রতিষ্ঠানের পরিচালক বলেছে- ঢাকার আইপিএই ও শিশু হাসপাতালে পরীক্ষা শুরু হয়েছে।

যদি অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা না থাকে তাহলে এখন এসব প্রতিষ্ঠানে পরীক্ষা হবে কিভাবে। ডা. জাহিদ বলেন, আইইডিসিআর’র ওপর নির্ভর না করে এই ল্যাবগুলোকে আরও দুই মাস আগে থেকে প্রস্তুত করা হলে এই দুরবস্থা হতো না। সাসপেক্টেড কেসগুলো পরীক্ষার আওতায় আনা হতো। সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে থাকত। স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ যুগান্তরকে জানিয়েছেন, ঢাকা ও ঢাকার বাইরের আরও কয়েকটি স্থানে কোভিড-১৯ এর নমুনা পরীক্ষা করা হবে।

ঢাকার জনস্বাস্থ্য ইন্সটিটিউট, শিশু হাসপাতাল, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এই রোগের নমুনা পরীক্ষার ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। তবে ঢাকার বাইরে চট্টগ্রামের ফৌজদারহাটে বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অব ট্রপিকাল অ্যান্ড ইনফেকশাস ডিজিজেস বৃহস্পতিবার থেকেই পরীক্ষা শুরু হয়েছে। কক্সবাজার মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আইইডিসিআরের ফিল্ড ল্যাবরেটরি, ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, বরিশাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেও এ পরীক্ষা পদ্ধতি সম্প্রসারণ করা হচ্ছে।

Leave A Reply

Your email address will not be published.