আসুন জেনেনেই:যেভাবে থামতে পারে করোনার মহামারী

0

করোনাভাইরাসে আক্রান্ত মানবজাতি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কর্তৃক করোনাভাইরাসকে বৈশ্বিক মহামারী ঘোষণা করা হয়েছে অনেক আগেই। একাধারে যেমন চীনকে ছাপিয়ে ইতালি, স্পেনের মতো দেশগুলোতে লাশের মিছিল বেড়ে চলেছে। বিশ্বের সবকিছু হঠাৎ করেই থমকে গেছে। কোয়ারেন্টাইনে আছে বিশ্বের এক-তৃতীয়াংশ মানুষ। সারা বিশ্বে উদ্বেগজনক হারে ছড়িয়ে পড়ছে নতুন করোনাভাইরাস। লকডাউন, সামাজিক দূরত্ব সৃষ্টি প্রভৃতি নানা উপায়ে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ছড়ানো ঠেকানোর চেষ্টা চলছে। প্রতিটা মহামারী শেষ হওয়ার কিছু প্রক্রিয়া আছে। আজকের রকমারিতে থাকছে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত এমন কিছু প্রক্রিয়ার কথা। যার মাধ্যমে শেষ হতে পারে করোনাভাইরাসের মহামারী…।

নিয়ন্ত্রণ করতে হবে প্রাথমিক পর্যায় থেকে: মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়া নভেল করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে বিশ্বজুড়ে মৃত্যুর সংখ্যা ৩০ হাজার ছাড়িয়েছে। এর মধ্যে অর্ধেকেরও বেশি মানুষের মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে ইউরোপের দুটি দেশ ইতালি ও স্পেনে। চীনের উহান থেকে সংক্রমণ শুরু হলেও তা এখন বিশ্বের ২০৩টি দেশ ও অঞ্চলে পৌঁছে গিয়ে ছয় লাখ ৬২ হাজার ৭৫১ জনকে আক্রান্ত করেছে বলে জানায় বার্তা সংস্থা রয়টার্স। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও অফিসের কারণেই বেশির ভাগ মানুষ ঘরের বাইরে যায়। অপরিহার্য কাজগুলো করতে যাওয়া কিছু মানুষকেও ঘরে রাখা গেলে বায়ুদূষণ, মাটি দূষণ, পানি দূষণ তথা পুরো পরিবেশ দূষণ কিছুটা হলেও নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।

তা ছাড়া বাইরে গেলে কীভাবে চলা উচিত, হাঁচি-কাশি দেওয়ার সময় কী করা উচিত বা নিজেকে ও পরিবেশকে পরিচ্ছন্ন রাখতে কী কী করা যেতে পারে তা করোনাভাইরাস আমাদের ভালো করেই শিখিয়ে দিচ্ছে। কিন্তু শিক্ষাটা শুরু থেকেই করা উচিত, যখন কোনো অঞ্চলে এর প্রাদুর্ভাব দেখা দেবে। কারণ নতুন রোগকে একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলে নিয়ন্ত্রণ করার সুযোগ থাকে রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দেওয়ার প্রাথমিক পর্যায়ে। কিন্তু নতুন করোনাভাইরাসের ক্ষেত্রে সেটি করা সম্ভব হয়নি। ফলে রোগের বিস্তার একটি এলাকায় সীমাবদ্ধ করে তা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণের সুযোগ এখন সীমিত। এরই মধ্যে মহামারীর তিনটি বৈশিষ্ট্যই পূরণ করে ফেলেছে নতুন করোনাভাইরাস।

প্রাকৃতিক উপায়ে কমে যেতে পারে এর বিস্তার: ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন বলেছেন, তিন মাসের মধ্যে তার দেশ করোনাভাইরাস মহামারীর লাগাম টানতে পারবে বলে তার বিশ্বাস। তার এ বিশ্বাস যদি সত্যি প্রমাণিত হয়, তারপরও এ মহামারীকে পুরোপুরি বিদায় জানানোর দিন এখনো বহুদূর, হতে পারে সময়টা কয়েক বছর। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একটি মহামারী তখনই শেষ হয় যখন নতুন ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার মতো সংবেদনশীল মানুষের সংখ্যা কমে আসে। ১৯১৮ সালে স্প্যানিশ ফ্লু মহামারীর সময় বিশ্বব্যাপী ৫০ কোটি মানুষ তাতে আক্রান্ত হয়েছিল। এক পর্যায়ে নিজের থেকেই স্প্যানিশ ফ্লুর বিস্তার কমে যায়।

বর্তমান বিশ্বায়নের যুগের আগেও কোটি কোটি মানুষ মহামারীতে মৃত্যুবরণ করেছে। মাত্র এক দশকের কিছু বেশি সময়ের মধ্যেই পূর্ব এশিয়া থেকে পশ্চিম ইউরোপে মহামারী প্লেগের ভয়াবহতা ছড়িয়ে পড়ে। এতে প্রায় সাড়ে ৭ কোটি থেকে ২০ কোটি মানুষ মারা যায়, যা সমগ্র ইউরাশিয়ার জনসংখ্যার এক-চতুর্থাংশেরও বেশি ছিল। কিন্তু তাও একসময় কমে যায়। কারণ যারা এই ফ্লুতে আক্রান্ত হয়েও বেঁচে ছিল তাদের মধ্যে ওই রোগ প্রতিরোধ করার ক্ষমতা জন্মায়। ফলে ভাইরাসটি শুরুতে যেভাবে ছড়াচ্ছিল, পরে আর তা হয়নি। ভাইরাসটি যখন এই চক্রে এগোতে গিয়ে একজনকে আর আক্রান্ত করতে পারে না তখন সেই চক্রটি ভেঙে যায়। তবে এই প্রক্রিয়াটি সময়সাপেক্ষ।

ভ্যাকসিন বা টিকা উদ্ভাবন: বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের সংবাদ পর্যালোচনা করে জানা গেছে, ব্যবহারের জন্য ওই টিকা হাতে পেতে অন্তত আরও কয়েক মাস পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতে পারে। তবে বিশ্বের স্বাস্থ্য ও মহামারী সংক্রান্ত সংস্থাগুলোর প্রত্যাশা কয়েক মাসের মধ্যে অন্তত একটি কার্যকরী চিকিৎসা পদ্ধতি আবিষ্কার হবেই। যে কোনো নতুন ভাইরাস ঠেকানোর সহজ উপায় হলো ভ্যাকসিন বা টিকা উদ্ভাবন। পৃথিবীর বিজ্ঞানীরা নতুন করোনাভাইরাসের টিকা উদ্ভাবনে কাজ করে যাচ্ছেন। সব কিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগিয়ে গেলে তিন মাসের মধ্যে মানবদেহে এই টিকার পরীক্ষা চালানো সম্ভব হবে।

বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের সংবাদ পর্যালোচনা করে জানা গেছে, ব্যবহারের জন্য ওই টিকা হাতে পেতে অন্তত আরও কয়েক মাস পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতে পারে। তবে বিশ্বের স্বাস্থ্য ও মহামারী সংক্রান্ত সংস্থাগুলোর প্রত্যাশা, কয়েক মাসের মধ্যে অন্তত একটি কার্যকরী চিকিৎসা পদ্ধতি আবিষ্কার হবেই। ইউনিভার্সিটি অব নটর ডেমের রোগতত্ত্বের শিক্ষক অ্যালেক্স পারকিনস বলছেন, যে কোনো মহামারী ঠেকাতে ভ্যাকসিন খুবই আদর্শ একটি উপায়। কারণ, এর মাধ্যমে সংক্রমণ ঠেকানো যায় এবং একটি বিশাল জনগোষ্ঠীর মানুষের মধ্যে সুনির্দিষ্ট রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা জন্মানো যায়। এর আগে ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, পৃথিবীতে যে কোনো রোগের ভ্যাকসিন তৈরির ক্ষেত্রে দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন হয়ে থাকে। এ কারণেই নতুন করোনাভাইরাসের ভ্যাকসিন বা টিকা তৈরি প্রসঙ্গে নিশ্চিত কিছু বলতে পারছেন না কেউই।

জীবনযাত্রায় আচরণগত পরিবর্তন আনতে হবে: আচরণগত ও অভ্যাসে পরিবর্তন আনতে হবে মানুষকে। ইতিমধ্যে মানুষের জীবনযাত্রায় পরিবর্তন এসেছে। ইউনিভার্সিটি অব এডিনবার্গের সংক্রামক রোগতত্ত্বের অধ্যাপক মার্ক উলহাউস বলছেন, ‘নিজেদের জীবনাচরণ, আচরণ ও অভ্যাসে পরিবর্তন আনতে হবে। এর মাধ্যমে নতুন করোনাভাইরাসের ছড়িয়ে পড়ার হার কমিয়ে আনা যেতে পারে। মানুষজন হাইজেনিক জীবনযাপন শুরু করেছে।’ হাঁচি-কাশি দিলে যে টিস্যু ব্যবহার করবেন তা নির্দিষ্ট স্থানে ফেলতে হবে। ভাইরাস যাতে না ছড়াতে পারে সেদিকে সর্বদা খেয়াল রাখতে হবে। তাই সবসময় সাবান দিয়ে অন্তত ২০ সেকেন্ড ধরে দুই হাত ধুয়ে নেবেন অথবা চাইলে হ্যান্ড স্যানিটাইজার ব্যবহার করতে পারেন। অনেকের পশুপাখি থাকে। কোনো পশুপাখি অসুস্থ হয়ে পড়লে সেটিকে সরিয়ে ফেলুন। জনসমাগম এড়িয়ে চলতে হবে এখন সবাইকে। ঘরে বা বাড়িতে থাকতে হবে সবার। তাহলেই আমরা এ প্রাণঘাতী ভাইরাস থেকে মুক্ত থাকতে পারব। আতঙ্কিত না হয়ে সবার উচিত সাবধানতা অবলম্বন করা।

আনুষঙ্গিক অন্যান্য চিকিৎসা ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে: এ ভাইরাস একজন থেকে আরেকজনের মধ্যে সংক্রমণের সুযোগ যদি না পায়, তাহলে তা ছড়াবে না। আবার দ্রুত সময়ের মধ্যে শনাক্ত করা গেলে ব্যবস্থাপনা কাজ অনেক সহজ হয়ে যায়। তৈরি আছে এমন কিছু ওষুধকে নতুন করোনাভাইরাসের ক্ষেত্রে কার্যকরী বলে ভাবা হচ্ছে। অধ্যাপক ডা. এ বি এম আবদুল্লাহ বলেছেন, করোনাভাইরাস নিয়ে ভয় পাবেন না, আতঙ্কিত হবেন না। ভয়ের পরিবর্তে মানুষ যদি অধিকতর সচেতন থাকে, তাহলে করোনাভাইরাস প্রতিরোধ করা কঠিন কিছু নয়। এ ভাইরাস একজন থেকে আরেকজনের মধ্যে সংক্রমণের সুযোগ যদি না পায়, তাহলে তা ছড়াবে না।

আবার দ্রুত সময়ের মধ্যে শনাক্ত করা গেলে ব্যবস্থাপনা কাজ অনেক সহজ হয়ে যায়। নতুন এ করোনাভাইরাসের জন্য এখনো কোনো টিকা বা চিকিৎসা উদ্ভাবন না হলেও আনুষঙ্গিক অন্যান্য চিকিৎসা ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে মৃত্যু ঠেকানো সম্ভব। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তৈরি আছে এমন কিছু ওষুধকে নতুন করোনাভাইরাসের ক্ষেত্রে কার্যকরী বলে ভাবা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রে এরই মধ্যে এমন বেশ কিছু ওষুধ শনাক্ত করা হয়েছে। এদিকে আমাদের সবাইকে গুজব থেকেও সাবধান থাকতে হবে। ডিজিটাল যুগে যে কোনো ভুল তথ্য আগের চেয়েও দ্রুত ছড়ায়। গুজবের কারণে চিকিৎসা ব্যাহত হতে পারে। এদিকে বিভিন্ন রোগের কারণ হিসেবেই গোপন জীবাণু অস্ত্র কর্মসূচির কথা বারবার সামনে আসে। একইভাবে এবার ষড়যন্ত্রতত্ত্বপ্রেমীদের দাবি নভেল করোনাভাইরাস পৃথিবীর কোনো গবেষণাগারে কৃত্রিম উপায়ে তৈরি করা হয়েছে। যদিও এসব দাবির পক্ষে কোনো প্রমাণ নেই।

বাড়াতে হবে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা:খুব সহজেই আমাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে পারি। দিনের শেষে যা প্রতিরোধ গড়ে তুলবে করোনাসহ যে কোনো ভাইরাস জাতীয় অসুস্থতা থেকে। পুষ্টিবিদ চৌধুরী তাসনীম হাসিন জানান, ভিটামিন এ, সি, কে এবং ফলই সমৃদ্ধ খাবার বাড়াতে পারে আমাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা। অর্থাৎ দৃঢ় করবে আমাদের প্রতিরোধ ব্যবস্থা (ইমিউন সিস্টেম)। রঙিন শাকসবজি এবং টক জাতীয় বেশি ফল যার অন্যতম উৎস। বেদানায় আছে ক্ষমতাসম্পন্ন anthocyanin যা ভাইরাসের আক্রমণ থেকে আমাদের রক্ষা করে। পর্যাপ্ত পরিমাণে বিশুদ্ধ গরম পানি প্রতি ঘণ্টায় পান করা জরুরি। এর সঙ্গে যুক্ত হতে পারে মধু ও আদা যা আমাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে বাড়াবে এবং পাশাপাশি anti-inflammatory এবং antioxidant হিসেবে কাজ করবে। দেশের আরেক রোগ তত্ত্ববিদ জানান, করোনাভাইরাসের সাধারণ ক্যাটাগরিগুলো নিয়ে উদ্বেগ নেই। সাধারণ রোগ হিসেবে অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও এই সাধারণ ক্যাটাগরির করোনাভাইরাস ঘরে ঘরে বিভিন্ন সময় দেখা যায়, যা বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এমনিতেই সেরে যায়। সাধারণ কোনো ভাইরাসের সঙ্গে কোনো রোগীর অন্য জটিলতা যুক্ত হওয়ায় ক্ষেত্রবিশেষে হাসপাতালে যাওয়ার প্রয়োজন হয়। ফলে সাধারণ করোনাভাইরাস নিয়ে শঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই।

আতঙ্কিত হওয়া যাবে না কোনো অবস্থাতেই: বর্তমানে বিশ্বব্যাপী আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়ানো নতুন করোনাভাইরাসে (কভিড-১৯) মৃত্যুহার বৈশ্বিকভাবে মাত্র ০.৭ শতাংশ। নতুন করোনাভাইরাসের রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। একই সঙ্গে মানুষের ভিতরও আতঙ্ক ছড়াচ্ছে। কেউ কেউ আবার বলছেন, পৃথিবী ধ্বংস অনিবার্য হয়ে উঠেছে। চীনের এই ভাইরাস প্রতিরোধে যে ভীতিকর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে তার পরিণতিতেই বিশ্বব্যাপী আতঙ্ক ছড়িয়েছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। বিশেষজ্ঞরা আতঙ্কিত না হয়ে এই ভাইরাস প্রতিরোধে সবাইকেই সতর্ক থাকার পরামর্শ দিচ্ছেন। হাসপাতালে ভর্তি, কোয়ারেন্টাইন বা যে কোনো কারণে যদি আলাদা করতেই হয়; তবে টেলিফোন বা অন্য মাধ্যমের সাহায্যে যোগাযোগ রক্ষা করতে হবে এবং শিশুদের নিয়মিত অভয় দিতে হবে। সবাইকে এ সময়টাতে সাবধান থাকতে হবে সব পর্যায়ে। আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অন্যান্য প্রাণীর মাঝেও থাকতে পারে করোনাভাইরাস। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, একটি রোগ পৃথিবীর বুক থেকে পুরোপুরি নির্মূল করা অত্যন্ত দুরূহ কাজ। মানুষের বা অন্য প্রাণীর দেহে কোনো না কোনোভাবে যে কোনো ভাইরাস থেকে যেতে পারে। যা পরবর্তীতে আবার ছড়িয়ে পড়তে পারে। টেনেসির ভ্যানডারবিল্ট ইউনিভার্সিটির সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ উইলিয়াম স্ক্যাফনার মনে করেন, নতুন করোনাভাইরাস যেহেতু অত্যন্ত সংক্রামক, সেহেতু এটি কখনই পুরোপুরি অদৃশ্য হবে না।

Leave A Reply

Your email address will not be published.