Home » এক্সক্লুসিভ » শাকিলের শৈশব থেকে বড় হয়ে উঠার গল্প

শাকিলের শৈশব থেকে বড় হয়ে উঠার গল্প

জাহিদ নেওয়াজ খান : না, তাকে কখনো খেলার মাঠে পাইনি আমরা। সকাল না হতেই আমরা যখন ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ ছাত্রাবাসের মাঠে ফুটবল বা ব্যাট-বল নিয়ে দৌড়াতাম, কিংবা দুপুর না পেরোতেই অন্য কোন খেলার মাঠে; এমনকি কখনো কখনো তাদের বাসার সামনে ছোট মাঠেই চার-ছয় হাঁকাতাম, তাকে দেখতাম বই হাতে বাসা থেকে বেরিয়ে যাচ্ছেন কিংবা ফিরছেন বাসায়।

তাদের তখনকার টিনশেড বাড়ির ডানদিকের বাসার মাহবুবুর রহমান সেলিম জাতীয় ক্রিকেট দলে খেলেছেন, বামদিকের বাড়ির সানোয়ার হোসেনও। ক্রিকেট এবং ফুটবলে ময়মনসিংহ শহরের ওই মহল্লা বাঘমারা থেকে আরো অনেকে উঠে এসেছেন, কিন্তু তাকে কখনো ব্যাট হাতে কিংবা পায়ে ফুটবল নিয়ে দৌড়াতে দেখিনি।

ফুটবল বা ক্রিকেটে নাম লেখালেও তিনি হয়তো দেশসেরা হতেন, কিংবা হতেন না; কিন্তু বাংলাদেশের জন্য আবেগের সবটা দিয়ে দর্শক হিসেবে গলা ফাটানো ছাড়া তিনি খেলার বিষয়ে কখনো তেমন আগ্রহী ছিলেন না। বিশ্বকাপ ক্রিকেটে বাংলাদেশের অসাধারণ পারফরম্যান্সের পর তিনি নিজ হাতে রান্না করে আমাদেরকে খাইয়েছেন, সানোয়ারকে সামনের বছর বিপিএলে ময়মনসিংহের একটা টিম করার জন্য প্রস্তুতি নিতে বলেছিলেন, ময়মনসিংহের মাহমুদুল্লাহ রিয়াদ যেন ময়মনসিংহ দলেই থাকেন সেটা চেয়েছেন, কিন্তু আমাদের ছোটবেলায় তাকে যে মাঠে পাইনি তার কারণ তখনই তিনি তার জীবনের গন্তব্য ঠিক করে নিয়েছিলেন। ফুটবলার বা ক্রিকেটার হওয়াও অনেক গৌরবের বিষয়, কিন্তু তিনি জানতেন মানুষকে শুধু আনন্দ দেওয়াটাই শেষ কথা নয়, মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে রাজনীতি। তাই স্কুল জীবনেই রাজনীতিতে জড়িয়েছিলেন। তিনি মাহবুবুল হক শাকিল।

১৯৮০ সালে আমরা ভাড়া বাসায় বাঘমারায় চলে আসার অল্পদিনের মধ্যেই শাকিল ভাইকে চিনতে পারি। বয়সে তিনি আমাদের চেয়ে খুব যে একটা বড় এমন নয়, মাত্র কয়েক বছরের। কিন্তু তখন থেকেই তার অসম্ভব ব্যক্তিত্ব আমাদের মতো পিচ্চি-পাচ্চাকে তার সামনে নতজানু করে দিতো। আরেকটু বড় হওয়ার পর তাকে সবসময় মোটা ফ্রেমের চশমা আর পাঞ্জাবি পরতে দেখেছি। এবং হাতে অবশ্যম্ভাবীভাবে মোটা বা চিকণ বই। ততদিনে তিনি ছাত্ররাজনীতিতে জড়িয়েছেন। সাহিত্যের শিক্ষক মায়ের কাছ থেকে পাঠ নিয়ে এতদিন তিনি শুধু গল্প-উপন্যাস-কবিতা পড়লেও এবার তার রাজনীতিক বাবার মতো তার পাঠে যোগ হলো দর্শন, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, সমাজতত্ত্ব, ইতিহাস এবং এরকম সব গুরুগম্ভীর বিষয়। সঙ্গে আগের মতো সাহিত্যপাঠতো চলছিলই।

অনেকদিন দেখেছি মোটা ফ্রেমের চশমা পরা শাকিল ভাই বাঘমারা সড়ক ধরে হেঁটে যাচ্ছেন। আমরা ছোটরা টুকটাক সালাম দিয়ে উঁকি দিয়ে তার হাতে থাকা বইটির নাম দেখার চেষ্টা করতাম। ‘তোরা ক্যামোন আছিস? কী করছিস?’—এরকম সাধারণ দুয়েকটা কথা বলে তিনি চলে যেতেন। কখনো কখনো বড়জোর বইটা কার লেখা আর কী বিষয়ে বই সেটা নিয়ে একটু-আধটু কথা বলতেন তিনি। আমরা একটু ভয়মিশ্রিতভাবেই দুয়েকটা প্রশ্ন করতাম। তিনি তেমন একটা উত্তর দিতেন না।

সত্য যে আমরা তাকে খুব ভয় পেতাম, কেন পেতাম সেটা জানি না। হতে পারে তার ছোট ভাইয়েরা আমাদের বন্ধু, তাদের বড়ভাই মানে আমাদেরও বড়ভাই; সেরকম একটা বোধ কাজ করতো। তিনিও একটা দূরত্ব রাখতেন। কোন না কোন ছুঁতোয় তার সংগঠনে রিক্রুট করার মতো কোনো চেষ্টা করতেন না। এর কারণ ছিল: তিনি ওই রাজনীতিতে বিশ্বাস করতেন না যেখানে মহল্লা থেকে যে যত বড় মিছিল নিয়ে যাবে সে তত বড় নেতা।

আমরা আরেকটু বড় হতে হতে ঘিয়ে কালারের পাঞ্জাবি পরা শাকিল ভাইকে হারিয়ে ফেললাম। জানতাম যে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছেন। তবে অসম্ভব মেধাবী হলেও তথাকথিত আকর্ষণীয় কোন বিষয়ে তিনি ভর্তি হননি, জীবনের লক্ষ্যের সঙ্গে মিলিয়ে সমাজবিজ্ঞানে ভর্তি হয়েছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি ছাত্ররাজনীতিতে একটু একটু করে নিজের পরিচিতি গড়ে তুলছেন সেটাও একটু আধটু জানতাম। তাকে দেখে একজন ছাত্রনেতাকে ভাল করে জানার ও বুঝার আগ্রহ ছিল আমাদের। সেটা সম্ভব হলো ১৯৮৯ সালে আমিও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম যেদিন তার সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলাম সেদিন যে তার সঙ্গেই দেখা করতে যাচ্ছি সেটা জানতাম না। সহপাঠী নজরুল ইসলাম মিঠু একদিন বলল, ‘চল- তোর সঙ্গে একজনের দেখা করিয়ে দেই।’ কে জানতে চাইলে মিঠু বলল, ‘গেলেই বুঝতে পারবি।’ এক দুপুরে আমরা স্যার এ এফ রহমান হলে মিঠুর রুমে গেলাম, সেখান থেকে মিঠু অন্য এক কক্ষে যার কাছে নিয়ে গেল তিনি মাহবুবুল হক শাকিল। সেদিন


প্রথম দীর্ঘ সময় কথা হলো শাকিল ভাইয়ের সঙ্গে। এত এত বিষয়ে আলোচনা যে আমরা তার কথায় মুগ্ধ। এতদিন নিজের মহল্লায় তাকে শুধু দেখে মুগ্ধ ছিলাম, এখন মুগ্ধ হলাম তার কথায় এবং পাণ্ডিত্যে।

পরের কয়েক বছর ছাত্ররাজনীতিতে তার উত্থান দেখেছি। ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক হয়েও না হতে পারার খবর লিখেছি। কিন্তু, ব্যক্তিগত সম্পর্কের সূত্রে তিনি নিজে কখনো এসে ‘ওই খবর দিবি বা দিবি না’ কিংবা ‘ওই খবরে আমার নাম দিয়ে দিবি’– এরকম কিছু বলেননি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর প্রথম বর্ষ থেকেই যেহেতু সাংবাদিকতায় জড়িয়ে পড়ি, আর তিনি বরাবরই যেহেতু রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট তাই সাংবাদিক হিসেবে তার সঙ্গে আমার উঠাবসা ২৫ বছরের কিছু বেশি সময়। এ সময়ে কখনো তাকে ব্যক্তিগত স্বার্থে আমার বা অন্য সাংবাদিকদের সঙ্গে ‘কাঙালপনা’ করতে দেখিনি।

ব্যক্তিগত সম্পর্কের সূত্র ধরে কয়েকবার শুধু আমাকে ধানমন্ডির একটি খুব গুরুত্বপূর্ণ বাড়িতে একটি কক্ষে কম্পিউটারের সামনে বসিয়ে কিছু অনুবাদ করিয়ে নিয়েছেন। তখন আওয়ামী লীগ এবং আওয়ামী লীগ সভাপতির গবেষণা সেলে কাজ করার সূত্রে সেগুলো তার কাজের খুব গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল। পরে তিনি শেখ হাসিনার সঙ্গে আমাকে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার সময় শুধু এটা বলেছেন, ‘আমার ছোটভাই জুয়েল।’ ‘আমাকে কেন সাংবাদিক হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিলেন না?’– জিজ্ঞেস করলে বলেছিলেন, ‘তোমাকে আমি সাংবাদিক হিসেবে নিয়ে আসিনি। তুমি এসেছো আমার ছোটভাই হিসেবে। বাবু বা রোমেলকে নিয়ে এলে তাদের যেভাবে ছোটভাই বলতাম, তোমাকেও তাই বলেছি।’ আমার মুখে আর কোন শব্দ নেই। আমি জানতাম খুব সিরিয়াস হলে শাকিল ভাই আমার সঙ্গে তুই থেকে তুমিতে কথা বলেন।

এখন আওয়ামী লীগের গবেষণা সেলের জন্য হয়তো অনেক টাকা আছে। কিন্তু, শাকিল ভাইরা সেটা পরিচালনার সময় ‘নূন আনতে পান্তা ফুরোয় অবস্থা’। তখন নিজেই অনেক কাজ করার পাশাপাশি ব্যক্তিগত সম্পর্ক দিয়ে অনেককে দিয়ে কাজ করিয়ে নিতেন। তিনি ডাকলে না করতে পারতাম না বলে মাঝেমধ্যে বাংলা থেকে ইংরেজি করে দেওয়ার দায়িত্ব পড়তো আমার উপর। সেজন্য লাল-চা বরাদ্দ ছিল, ডাল-সবজিসহ তিন আইটেমের লাঞ্চও। কিন্তু, ওই মানুষটিকে খুব পছন্দ করতাম বলে পেশাদার হতে পারতাম না। মাঝেমধ্যে অবশ্য মজা করে মনে করিয়ে দিতাম: অন্য জায়গায় এ কাজ করলে অতো টাকা পাওয়া যেতো। একবার স্পেনের ‘এল মুন্ডো’ টিভির জন্য ১৬ দিন কাজ করে ১৬’শ ডলার পাওয়ার উদাহরণ দিয়ে বলতাম, ‘আমার কাজের দাম কিন্তু অতো।’ তিনি হাসতেন আর বলতেন, ‘তাহলে ওই টাকা দিয়েই বরং আমরা খাই-দাই করি।’ মাঝেমধ্যে অবশ্য বলতেন, ‘একদিন সুদে-আসলে ফিরিয়ে দেব সব।’ আমি বলতাম, ‘দোয়া করবেন যেন তার প্রয়োজন কখনো না হয়।’

মনে আছে, আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করার পর তিনি উপ-প্রেসসচিব হওয়ার পর মাঝেমধ্যে লাঞ্চে আমন্ত্রণ জানাতেন। বলতেন, ‘সব মাছ-ভাতের আইটেম, কিন্তু তোর অনুবাদের ওই সময়ের চেয়ে অনেক ভাল এবং অনেক বেশি।’ তার ওই নিমন্ত্রণগুলোতে আমি সাড়া দিতাম না। আমি যে সরকারি জায়গায় খুব স্বচ্ছন্দ না এটা তিনি বুঝতেন। পরে ফোন করে বলতেন, ‘আরে গাধা! তুইতো মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে আসছিস না। তুই আসছিস মাহবুবুল হক শাকিলের আমন্ত্রণে।’ তবু যাওয়া হয়নি কখনো।

দুয়েকবার তার আমন্ত্রণে আনুষ্ঠানিক ডিনারে গিয়েছি। তখন আমরা সেই সময়ের গল্প করতাম যখন কারো কাছেই খুব বেশি টাকা থাকতো না। কিন্তু মাহবুবুল হক শাকিলের ‘কলিজা’ ছিল। একবার আমার জন্মদিনের কথা জেনে রাত সাড়ে ১২টায় তিনি আমাদের সকলকে শেরাটনে নিয়ে গিয়েছিলেন, শেরাটনের সব রেস্টুরেন্ট বন্ধ পেয়ে সোনারগাঁও হোটেল, সেখানেও সবকিছু বন্ধ থাকায় গভীর রাতে কারওয়ান বাজারের স্টার কাবাবে কাচ্চি বিরিয়ানি। রনি মনে করিয়ে দিল যে, জন্মদিন ছিল বলে ওই রাতে আমরা মিষ্টিও খেয়েছিলাম।

সেই ১৯৮০ সাল থেকে ৩৬ বছরে শাকিল ভাইয়ের সঙ্গে দরকারে-অদরকারে দেখা হয়েছে অনেক। বিশেষ করে আমি ৮৯ সালে ভর্তি হওয়ার পর দু’জনই যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র তখন থেকে অসংখ্যবার। তবে, তার সঙ্গে আমার এক ধরণের দূরত্ব ছিল সবসময়ই। এর কারণ হয়তো এরকম যে, সেই ছোটবেলায় আমি যখন হাফপ্যান্ট পরে স্কুলে যাই আর তিনি একটু বড়, বিশেষ করে তার আপন ভাইয়ের মতো চাচাত ভাই রোমেল আমার বন্ধু হওয়ার কারণে এক রকমের বড়ভাই-ছোটভাই সম্পর্ক ছিল সবসময়। তার সঙ্গে জগতের হেন কোন বিষয় নেই যা নিয়ে আলোচনা হয়নি, কখনো তিনি আড্ডায় রগড় করলে আমাকে অন্যদিকে তাকিয়ে থাকতে বলতেন, কিন্তু তার ব্যক্তিগত বিষয়-আশয় নিয়ে আমার সঙ্গে কখনোই তেমন কোন আলোচনা করেননি।

আর তিনি যেহেতু প্রথমে প্রধানমন্ত্রীর ডিপিএস এবং পরে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী হিসেবে প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতার সঙ্গে সম্পর্কিত ছিলেন তাই একজন আরেকজনকে ছোটবেলা থেকে চিনতাম বলে আমাদের মধ্যে অকথিত ও অলিখিত একটা চুক্তি ছিল: কেউ ব্যক্তিগত কোন স্বার্থে বা কারণে এ বিষয়টা ব্যবহার করবো না। মনে আছে, শুধু একবার এক আমলা বন্ধুর পদোন্নতির বিষয়ে তাকে টেক্সট করেছিলাম। তার এমনিতেই পদোন্নতি পাবার কথা। কিন্তু, কোন কারণে যেন বাদ না পড়ে যায় সেজন্য তাকে একটু মনে করিয়ে দেওয়া। টেক্সটের শেষে বলেছিলাম, ‘সে প্রয়াত অমুক কবির পুত্রসম্পর্কীয় তমুক।’ জবাবে তিনি লিখেছিলেন, ‘ডান। নট ফর ইও, বাট ফর দ্যাট পোয়েট।’

অনেক পরিচয়ের মধ্যে মাহবুবুল হক শাকিলের এটাই আসলে শেষ পরিচয়। তিনি মনে এবং চলনে ছিলেন একজন কবি। তার কবিসত্ত্বার কথা সাধারণ মানুষ হয়তো তার বই প্রকাশ হওয়ার আগে জানতে পারেনি, কিন্তু এদেশের শীর্ষ কবিদের অনেকেই অনেক আগে থেকে তাকে কবি হিসেবেই চিনতেন, কিছুটা আমরাও। তার সঙ্গে আমার শেষ দুই দেখার একটি কবিদের এক আড্ডায়। একজন পরদিন যুক্তরাষ্ট্রে ফেরত যাবেন কিন্তু তার আগে তিনি মাহবুবুল হক শাকিলের সঙ্গে একটু দেখা করে যেতে চান। শাকিল ভাইকে ফোন করলে ধানমন্ডিতে এক কবির বাসায় চলে যেতে বললেন। সেখানে গিয়ে দেখি ঘরোয়া এক অনুষ্ঠান, উপস্থিত সকলেই বরেণ্যজন।

যে কবির বাড়ি তিনি যেহেতু আমাকে চেনেন, মাত্র কয়েকদিন আগেই তার ওই বাসায় একটা মিটিংও করেছি, অনাহূত আমাকে দেখে তিনি যেমন অবাক, তেমনি অন্যরাও। সেখানে উপস্থিত কারোরই বয়স ৭০-এর কম নয়। একজন শুধু তরুণ সেখানে। শাকিল ভাই আমাদেরকে দেখে বেরিয়ে এলেন। জানালেন, কবি শহীদ কাদরীর স্ত্রী নীরা কাদরী কাল চলে যাচ্ছেন, তার আগে এ ঘরোয়া অনুষ্ঠান। সেদিন বেশি কথা হয়নি। তবে, চলে আসার আগে তার স্বাস্থ্যহানির কথা মনে করিয়ে দিয়েছিলাম। উল্টো তিনি বললেন, ‘আমার চেয়ে বয়সে অনেক কম তোর স্বাস্থ্যইতো আমার চেয়ে খারাপ।’

তার ঠিক আগে কিংবা পরে দিল্লিতে বাংলাদেশের প্রেস মিনিস্টার হিসেবে নিয়োগ পাওয়া ফরিদ হোসেনের জন্য একটি সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে দেখা হয়েছিল ঢাকা ক্লাবে। শাকিল ভাই হঠাৎ আমাকে এবং রনি (মীর মাসরুর জামান)-কে ডেকে বললেন, ‘আয় তিন ভাই একটা ছবি তুলে রাখি। আমি মরে গেলে তোরা ভুলে গেলেও তোদের কাছে ওই ছবি আমাকে বাঁচিয়ে রাখবে।’ আমরা সোৎসাহে ছবি তুললেও তাকে এরকম অলক্ষুণে কথা বলতে না করলাম। আবার বিষয়টাকে যে খুব একটা গুরুত্ব দিয়েছি এমনও না। এরকম তিনি প্রায়ই বলতেন।

তার মধ্যে হয়তো সবসময়ই একটা মৃত্যুচিন্তা কাজ করতো। কিন্তু, তার মানে যে তিনি সত্যিসত্যিই এতো আগে চলে যাবেন সেটা দূরতম কল্পনাতেও ভাবিনি। এটা অবশ্য বুঝতাম যে, এই প্রচলিত জীবন তার ভালো লাগে না। তাই অনেক দেরিতে হলেও তার কবি ও সাহিত্যিক জীবনের প্রকাশে আমরা উচ্ছ্বসিত ছিলাম। কারণ আমরা বুঝতাম শেষ পর্যন্ত সৃষ্টিশীলতাই তার আসল ঠিকানা।

আর আমার ঠিকানা নিয়ে মাঝেমধ্যে তিনি একটা গল্প করতেন। সর্বশেষ ঢাকা ক্লাবেই এক ডিনারে প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিমসহ অন্য কয়েকজনকে তিনি ওই গল্প শুনিয়েছিলেন। আমি ক্লাস ফাইভের বৃত্তি পরীক্ষায় ফার্স্ট হওয়ার পর তার নাকি ধারণা ছিল যে, আমি পাইলট হবো। সেসময় নাকি তার মনে হতো, একজন মানুষের সর্বোচ্চ জায়গায় পৌঁছে যাওয়া মানে পাইলট হওয়া। অনেক জায়গায় তার এ গল্প শুনে একদিন জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘আপনি কি আমার সাংবাদিক হওয়ায় হ্যাপি নন?’ তার উত্তর ছিল: ‘মোর দ্যান হ্যাপি। লুক, মাই ইয়ঙ্গার ব্রাদার বাবু ইজ অ্যা ব্রিলিয়ান্ট বয়। সেই বাবু জার্নালিজমে পড়েছে, এখন সাংবাদিকতা করছে। তুই আর বাবু, আমার দুইটা ভাই সাংবাদিক, এটা আমার জন্য অনেক গর্বের, বাঘমারার দুইটা ছেলে সাংবাদিক হয়েছে, এটাও আমার জন্য অনেক গর্বের।’ পরে আবার চোখ টিপে বলতেন, ‘তবে তোরা খু্ব ট্র্যাডিশনাল। তারপরও বাবু ইজ বাবু।’

বাবুকে আমরা দেখেছি হাঁটি-হাঁটি-পা-পা সময় থেকে। সেই বাবু বুধবার অ্যাম্বুলেন্সের সামনের আসনে বসে জগতের সব বেদনা-দুঃখ-কষ্টকে বুকে চেপে শাকিল ভাইকে নিয়ে চলে গেলো। আমরা কিছুটা কাছের হলেও অনেক দূর থেকে ভাই হারানোর যন্ত্রণা অনুভব করছি। বাবুর কষ্টের তুলনায় এটা কিছুই না। চ্যানেল আই

লেখক : সাংবাদিক

 

Facebook Comments
(Visited 1 times, 1 visits today)

মন্তব্য

আপনার ইমেইল গোপন থাকবে - আপনার নাম এবং ইমেইল দিয়ে মন্তব্য করুন, মন্তব্যের জন্য ওয়েবসাইট আবশ্যক নয়

*

Open

Close