Home » খেলা » ড্যারেন স্যামি সার্থকতা কি ? তাকে মনে রাখবেন কিভাবে ?

ড্যারেন স্যামি সার্থকতা কি ? তাকে মনে রাখবেন কিভাবে ?

শচীন টেন্ডুলকার আপনার মনে কিভাবে জায়গা পাবেন? পরিসংখ্যানে আপনি আগ্রহী হলে পাবেন আন্তর্জাতিক আঙিনায় ৩৪০০০ এর কাছাকাছি রান,৬৬৪ ম্যাচ, প্রথম এবং এখন পর্যন্ত একমাত্র প্লেয়ার হিসেবে শত আন্তর্জাতিক সেঞ্চুরি দ্বারা। কিন্তু এই নিরস পরিসংখ্যানের ফাঁকফোকর গলে বেরিয়ে যাবে আরো হাজার রেকর্ডগাঁথা। আসলে শচীনকে ঠিক এইসব পরিসংখ্যান দিয়ে যাচাই করে নিজের হাসির পাত্রে পরিণত করতে ঠিক আপনিও চাইবেন না। কেননা, এই পরিসংখ্যানের সাধ্য নেই আপনাকে এটা বুঝানোর তিনি ব্যাটিংয়ে নামলে ঠিক কত লোক তার নামে প্রার্থনায় বসতো, শত কোটি মানুষের অন্তহীন চাপ কতদিন তিনি তার ঘাড়ে বয়েছেন। দিনশেষে তাই সেইসব পরিসংখ্যানের ধার না ধেরে আপনি বাধ্য হবেন একেকটি স্ট্রেইট ড্রাইভ কিংবা কাভার ড্রাইভ,আপার কাট কিংবা হুক পুলের নিক্তিতে শচীনকে মাপতে। দিনশেষে পরিসংখ্যান ছাপিয়ে আপনার স্মৃতিতে এই শটগুলিই থাকবে।

কিন্তু ক্রিকেট তো শুধু শচীনের মতো দেবদূতরাই খেলেন না, আরো সহস্রাধিক(কম বলে ফেললাম কি!!!) ক্রিকেটার খেলে গেছেন,ভবিষ্যতেও খেলবেন। কতজন ঠিক দাগ কেটে গেছেন আপনার মনে? মনে রেখেছেন কয়জনকে? আসলে মনে না রাখাটা আপনার দোষও না। তাদের তো মনে রাখার মতো কোন পরিসংখ্যানও নেই, নেই শচীন কিংবা ব্রায়ান লারাদের মতো কোনো ট্রেডমার্ক শটও। তবে মনে রাখার উপায়?

চলুন, আবারো হাত পাতি ‘ক্রিকেট ঈশ্বরের’ কাছে। বলে গিয়েছিলেন না, আমাকে যেন মানুষ ভালো ক্রিকেটার হিসেবে মনে না রেখে একজন ভালো মানুষ হিসেবেই মনে রাখে। তবেই নিজের জীবনের সার্থকতা খুঁজে পাবো।

তা জীবনের সার্থকতা তিনি খুঁজে পেয়েছিলেনও। ২৪ বছর পাপারাজ্জিদের আতশি চোখের নিচে থাকার পরও তার ক্লিন ইমেজ নষ্ট করতে আরো কিছুর সাহায্য নেওয়া লাগছে। তাতেও তার ভাবমূর্তি নষ্ট করতে ব্যর্থ মনোরথেই ফিরতে হচ্ছে।

ব্যর্থ হয়ে ফিরলেও একটা সান্ত্বনা পেতে পারেন এই ভেবে যে, অন্য সব রেকর্ডের মতো এই রেকর্ড তার একার নয়। একজন প্রতিদ্বন্দ্বী তিনি ইতোমধ্যেই পেয়ে গিয়েছেন। কারো কাছে বিনোদনের ফেরিওয়ালা, কারো কাছে ভাঁড়, তবে সব ছাপিয়ে তার বড় পরিচয় বোধহয় এটাই হবে, আপাদমস্তক একজন ভালো মানুষ। একজন অনুকরণীয় ব্যক্তিত্ব। তিনি ড্যারেন স্যামি।

ব্যাটিং স্ট্যান্সটা ঠিক নরমাল না। কেমন যেন ভাঙা ভাঙা। শটের কথা কি আর বলবো? প্রথম দেখায় যে কারোই মনে হতে পারে, এই ছেলে আজকেই কি প্রথম ব্যাট ধরলো! কিন্তু আর সব ক্যারিবিয়ান ব্যাটসম্যানের মতোই টাইমিং আর ঈশ্বরপ্রদত্ত প্রতিভা মানে গায়ের জোর মিলিয়ে মোটামুটি চলনসই ব্যাটসম্যান হিসেবে নাম কামিয়েছেন। সাথে যোগ করুন জেন্টল মিডিয়াম পেস। এই ফ্র‍্যাঞ্চাইজির দুনিয়ার রঙ্গমঞ্চ তো ড্যারেন স্যামিরই। টি২০ ক্রিকেট টুর্ণামেন্টের হটকেক হতে আর কি লাগে?

আসলে এই জায়গাতেও তাকে ঠিক আলাদা করে পরিচিত করাতে পারে এমন কোনো ব্যাপার নেই। সব ক্যারিবিয়ানের সাথেই আপনি চাইলে এই পরিচয়গুলো লেপে দিতে পারেন। বরং পাওয়ার হিটিংয়ের তুলনা করলে বাকি সব ক্যারিবীয় ব্যাটসম্যানের চেয়ে ঢের পিছিয়ে থাকবেন। টি২০ এর হটকেক যেহেতু, ৬৬ ম্যাচে ৫৩৪ রানের পরিসংখ্যান আপনার মনে তাকে একজন অর্ডিনারি ব্যাটসম্যান হিসেবে প্রভাব ফেলবে , জানা কথা। অবশ্য একজন লোয়ার অর্ডার ব্যাটসম্যানের জন্য রেকর্ডটা খারাপও না তেমন। কিন্তু অনেকের মাঝে একজন বলতে যেমন পরিসংখ্যান লাগে, তেমন উপাত্তের বড্ড অভাব।

কিন্তু জনাব, শুরুতেই বলে নিয়েছিলাম, পরিসংখ্যানের সাধ্য কম ক্রিকেটারের সার্থকতা প্রকাশ করতে। ড্যারেন স্যামি ঘরানার ক্রিকেটারের জন্য পরিসংখ্যানের আশ্রয় নেওয়া নিদারুণ অপচয়।

তাহলে ড্যারেন স্যামি সার্থকতা কি??? তাকে মনে রাখবেন কিভাবে???

২ বার বিশ্বকাপজয়ী ক্যাপ্টেন! বলা যেতে পারে। কিন্তু কিন্তু ওয়েস্টইন্ডিজের যেই দল তিনি পেয়েছেন, না জিতলে অন্যায়ই হতো। তার সার্থকতা তাই এই বিশ্বকাপ জয়ে নয়। বরং একেক দেশ থেকে আসা একেক ক্রিকেটারের মাঝে বন্ধন শক্ত করাই তার সার্থকতা। সব চ্যাম্পিয়ন ক্রিকেটারকে নিজের দায়িত্ব ঠিকভাবে পালন করাতে পারার মধ্যেই তার সার্থকতা।

তিনি মজা করতে ভালোবাসেন। তা কোন ক্যারিবিয়ান মজা করেন না! উল্টো এই দাবি আসতে পারে, দলে তিনিই সবচেয়ে কম মজা করেন। না কোনো নাচ বানিয়েছেন, না পুরো বিশ্বকে নাচিয়েছেন গ্যাংনাম স্টাইলে। যেটা করেছেন, নিজেকে নিয়ে চূড়ান্ত রকমের মজা করেছেন। আপনি কেন ক্যাপ্টেন, এই প্রশ্ন তিনি এড়িয়ে যেতে পেরেছিলেন এক না বলা উক্তিতেই, হাসির মাধ্যমে।

হাজার মাইল দূরের আমাদের বাংলাদেশি সাংবাদিকরা তাকে বানিয়ে ফেলেছিলেন বড় ভাই গোত্রের একজন হিসেবে। প্রেসবক্সে দুষ্টুমিভরা অঙ্গভঙ্গি, সবকিছুর উত্তরে সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক এক হাসি দেখলে এটা মনে হওয়া অস্বাভাবিক না, আমার জীবনে আর দু:খ নেই। এই অনুভূতি তৈরি করতে পারাঈ তার সার্থকতা।

ক্রিকেট যখন হয়ে যাচ্ছে বাণিজ্যের আরেক নাম, পিকনিক ছলে শুরু হওয়া টি২০ টুর্ণামেন্টেও ক্রিকেটাররা যখন চূড়ান্ত পেশাদার,দম বন্ধ করা উত্তেজনা, ড্যারেন স্যামির মতো ক্রিকেটাররা সেখানে এক পশলা বৃষ্টি। ক্রিকেট তো বিনোদনেরই অংশ। আর তার জন্যই দরকার একজন ড্যারেন স্যামি। প্রতিনিয়ত বিনোদন বিলিয়ে যাচ্ছেন এই কাঠখোট্টা পৃথিবীতে। ড্যারেন স্যামির সার্থকতা এই জায়গাতেই।

মার্ক নিকোলাস গত টি২০ বিশ্বকাপের আগে বলেছিলেন, ওয়েস্টইন্ডিজের জেতার মতো জ্ঞান নেই। শিরোপা জিতে ট্রেডমার্ক হাসিতেই ড্যারেন স্যামি তার জবাবও দিয়েছিলেন।

ডিয়ার ড্যারেন,আমাদের জ্ঞান লাগবে না, জবাব লাগবে না। তারা ম্যাচ জেতার হিসেব করুক, তুমি আমাদের হৃদয় জেতার হিসেব করে যাও। জন্মদিনে এই কামনাই করি।

শুভ জন্মদিন ড্যারেন স্যামি। হাসিটা চলতে থাকুক আরো বহু বছর। নাতি নাতনির কাছে গল্প করার যেন রসদ যেন এটা পাই, শচীন টেন্ডুলকারের স্ট্রেইট ড্রাইভ, লারার পুল, ড্যারেন স্যামির হাসি, ক্রিকেট মানে এগুলোই।

স্পোর্টস রিপোর্টার : রেজয়ান রহমান  ( ডিএনএন )

Facebook Comments
(Visited 1 times, 1 visits today)

মন্তব্য

আপনার ইমেইল গোপন থাকবে - আপনার নাম এবং ইমেইল দিয়ে মন্তব্য করুন, মন্তব্যের জন্য ওয়েবসাইট আবশ্যক নয়

*

Open

Close