ব্রেকিং:
Home » রাজনীতি » নারায়ণগঞ্জ নির্বাচনে ব্রেক থ্রুর আশায় বিএনপি

নারায়ণগঞ্জ নির্বাচনে ব্রেক থ্রুর আশায় বিএনপি

কাফি কামাল : দীর্ঘ দুঃসময়। সংকট আর সংকট। ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা। বার বার হোঁচট। কখনও নির্বাচনে অংশগ্রহণ। কখনওবা বর্জন। তবে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে চ্যালেঞ্জ হিসেবেই নিয়েছে বিএনপি। এই নির্বাচনে জয়ের প্রত্যাশা করছে দলটি। আশায় রয়েছে ব্রেক থ্রুর।

জাতীয় ও স্থানীয় একাধিক ইস্যুই তাদের মধ্যে তৈরি করেছে এ আশাবাদ। নির্বাচনে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত নেয়ার পর দলীয়ভাবে একাধিক মাঠ জরিপ করেছে দলটি। সে সব জরিপের ইতিবাচক ফলাফল, স্থানীয় নেতাদের ঐক্য, জোটের সমর্থন, প্রার্থী নির্বাচনে দূরদর্শিতা ও নারায়ণগঞ্জবাসীর পরিবর্তন প্রত্যাশী মনোভাব ও ধানের শীষের প্রচারণায় ভোটারদের স্বতঃস্ফূর্ত সাড়া বিএনপিকে করেছে আত্মবিশ্বাসী।

বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য ও নাসিক নির্বাচনে বিএনপি প্রার্থীর প্রধান সমন্বয়ক গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, বিএনপি নির্বাচনমুখী দল হিসেবে সব সময় নির্বাচনের মাধ্যমে জনপ্রতিনিধি নির্ধারণকে প্রাধান্য ও গুরুত্ব দেয়। কিন্তু সার্বিক পরিস্থিতিতে সময়ের প্রয়োজনে বিএনপিকে অনেক সময় নির্বাচন বর্জনও করতে হয়েছে। দেশের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে ভোট দিতে পারছে না। এ অবস্থায় জনগণের ভোটাধিকারের প্রতি সম্মান দেখিয়ে নাসিক নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে বিএনপি। রাজনৈতিক দলের জন্য প্রতিটি নির্বাচনই টেস্ট কেস।

গয়েশ্বর রায় বলেন, বর্তমান সরকারের আমলে নির্বাচন কমিশন নিজেরাই আইন লঙ্ঘন করে ভোটারদের অধিকার বঞ্চিত করেছে। কিন্তু বর্তমান নির্বাচন কমিশনের মেয়াদ শেষের দিকে। গণমাধ্যমসহ দেশের বিশিষ্ট ব্যক্তি ও বিশ্লেষকরা ধারণা করছে, শেষ বেলায় নাসিক নির্বাচনে গ্রহণযোগ্য একটি ভূমিকা রাখবে কমিশন। বিএনপিও দেখতে চায় কমিশন কতটুকু সংশোধিত হলো।

তিনি বলেন, ভোটারদের মধ্যে ভোট দিতে পারবো কিনা আশঙ্কা আছে। তবে এখন পর্যন্ত নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসনের ইতিবাচক ভূমিকা ভোটারদের মধ্যে আশাবাদ তৈরি করেছে। নির্বাচনের দিন পর্যন্ত এটা অব্যাহত থাকে ও সরকার যদি তাদের বাধ্য না করে তবে আমাদের প্রার্থী বিজয়ী হবে। কেন বিএনপি প্রার্থীর জয়ের আশা করছেন- এমন প্রশ্নের জবাবে গয়েশ্বর রায় বলেন, দেশের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে ভোট দিতে পারছে না এবং কেন পারছে না তা তাদের কাছে পরিষ্কার। ভোটাধিকার হরণসহ দেশের সার্বিক পরিস্থিতিতে সরকারের ওপর দারুণভাবে ক্ষুব্ধ সাধারণ মানুষ। তাই সুযোগ পেলেই তারা সরকারের প্রতি অনাস্থার প্রকাশ ঘটাবে।

তিনি বলেন, নারায়ণগঞ্জ দেশের অন্যতম প্রধান ব্যবসা কেন্দ্র। কিন্তু নারায়ণগঞ্জের ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ তাদের প্রয়োজনের


তুলনায় ১০ ভাগ সেবাও সামপ্রতিক বছরগুলোতে পায়নি। এবার সরকারদলীয় প্রার্থী হলেও সেলিনা হায়াৎ আইভী কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন করতে পারেনি। সে জন্য এবার নারায়ণগঞ্জবাসী পরিবর্তন প্রত্যাশী।

গয়েশ্বর রায় বলেন, আইভী নৌকা প্রতীক পেলেও আওয়ামী লীগের বড় অংশটির সঙ্গে তার বড় ধরনের মতানৈক্য রয়েছে। তিনি নৌকা প্রতীক পেলেও দলের নেতাকর্মীদের সমর্থন আদায় করতে পারেননি। তার গণসংযোগে প্রকাশ পাচ্ছে তিনি দলের চেয়ে নিজেকে বেশি জনপ্রিয় মনে করছেন। প্রচারণা আছে, তিনি আওয়ামী লীগের কাউকে তোয়াক্কা করেন না, কারও কথা আমলেও নেন না। ফলে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা দায়িত্ব নিয়ে তার পক্ষে মাঠে নামছে না। বিএনপি প্রার্থী সাখাওয়াত হোসেন খান স্থানীয় ও কেন্দ্রীয়ভাবে যে ঐক্যবদ্ধ সমর্থন পাচ্ছেন তা আইভীর জুটছে না। এছাড়া গত নির্বাচনে আইভী জিতেছিলেন শেষ মুহূর্তে বিএনপির ভোট যোগ হওয়ায় এবার সেটাও তিনি পাচ্ছেন না।

বিএনপির অন্যতম এ নীতিনির্ধারক বলেন, সেভেন মার্ডার নারায়ণগঞ্জবাসীর হৃদয়ে একটি বড় ক্ষত। বিএনপি প্রার্থী সাখাওয়াত হোসেন সে হত্যাকাণ্ডের বিচারে বাদীপক্ষের প্রধান আইনজীবী। সে হত্যাকাণ্ডের শিকার অ্যাডভোকেট চন্দন সরকারের ছেলে হলেন সাখাওয়াতের নির্বাচনী প্রস্তাবক। অন্যদিকে সেভেন মার্ডারসহ ত্বকী হত্যাকাণ্ডে আইভী যাদের বিরুদ্ধে এতদিন তীর ছুড়েছেন তাদেরকেই এখন নৌকার পক্ষে মাঠে নামতে হবে। ফলে নারায়ণগঞ্জের সংখ্যালঘু সমপ্রদায়, পেশাজীবী ও শান্তিপ্রিয় মানুষের সমর্থন পাবেন বিএনপি প্রার্থী।

তিনি বলেন, আইভীর চেয়ে সাখাওয়াত জনপ্রিয়তায় কোনোভাবেই পিছিয়ে নেই। বরং সাখাওয়াতের প্লাস পয়েন্ট হচ্ছে তার বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের মধ্যে কোনো সমালোচনা নেই। বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, সারা দেশের মানুষের মতো নারায়ণগঞ্জের মানুষও তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগের জন্য উন্মুখ হয়ে আছে। ভোটাররা তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারলে আমাদের পূর্ণ বিশ্বাস ধানের শীষ প্রতীকে বিএনপি প্রার্থী বিপুল ভোটে বিজয়ী হবে। কারণ সরকারের নানা কর্মকাণ্ডে মানুষ বিরক্ত, ক্ষুব্ধ। তার ওপর নারায়ণগঞ্জ সহিংসতাপ্রবণ এলাকা। এছাড়া দলীয় গ্রুপিংয়ের কারণে মেয়র হিসেবে শেষ পাঁচ বছর সেলিনা হায়াৎ আইভী কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন করতে পারেননি। সব মিলিয়ে নারায়ণগঞ্জের মানুষ পরিবর্তন প্রত্যাশী।

তিনি বলেন, নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরে বড় ধরনের বিভেদ রয়েছে। ফলে প্রকাশ্যে যত ঐক্যই হোক, সেখানে সরকারদলীয় নেতাকর্মীদের ভেতর ঐক্য কাজ করবে না। তবে সেখানে ভোটারদের চোখে-মুখে বিরাজ করছে আতঙ্ক। এখন ভোটারদের ভোট কেন্দ্রে নেয়া এবং তাদের ভোট দেয়ার সুযোগ নিশ্চিত করাই মূল চ্যালেঞ্জ। তিনি বলেন, সরকার একেক সময় একেক কৌশল করে। আমাদের আশঙ্কা সরকার নির্বাচনের আগের রাতেও কৌশল পরিবর্তন করে ফলাফল কেড়ে নেয়ার চেষ্টা করতে পারে। এছাড়া আওয়ামী লীগের দুইগ্রুপের কাউন্সিলর প্রার্থীরা প্রভাব খাটিয়ে সিল মারলে তার নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে মেয়রের ভোটেও।

বিএনপির দপ্তরের দায়িত্বপ্রাপ্ত সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রিজভী আহমেদ বলেন, ৫ই জানুয়ারির একতরফা জাতীয় নির্বাচন বর্জন করলেও বিএনপি বর্তমান সরকারের আমলে প্রতিটি স্থায়ী নির্বাচনে অংশ নিয়েছে। কিছু নির্বাচনে ভালো ফল পেলেও বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সরকার ফল কেড়ে নিয়েছে। কিন্তু নির্বাচনমুখী দল হিসেবে দেশবাসী ও বিশ্ববাসীর আগ্রহের প্রতি সম্মান রেখে বিএনপি নির্বাচনে অংশ নিয়েছে। নাসিক নির্বাচনে অংশগ্রহণও তারই ধারাবাহিকতা।

রিজভী আহমেদ বলেন, বিএনপি প্রার্থীর বিজয়ের ব্যাপারে আমাদের আশাবাদের জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ের বহু কারণ আছে। দেশে ভোটাধিকার হরণ, গণতন্ত্রহীনতা, নিরাপত্তাহীনতা, খুন-গুমের যে আতঙ্ক বিরাজমান সুযোগ পেলে ভোটাররা তার বিরুদ্ধে ক্ষোভের প্রতিফলন ঘটাবে। অন্যদিকে নারায়ণগঞ্জ সন্ত্রাসকবলিত এলাকা হিসেবে খ্যাত। সেখানে সংঘটিত নানা লোমহর্ষক ঘটনার সঙ্গে সরকারদলীয় কারও না কারও যোগসূত্র আছে বলে মানুষ মনে করে। আর আমাদের প্রার্থীর প্রধান পরিচয় তিনি নিরাপদ সমাজের পক্ষে যে আন্দোলন তার একজন অগ্রণী সৈনিক। তাই পরিবর্তন প্রত্যাশী মানুষ নারায়ণগঞ্জে ধানের শীষের প্রার্থী বেছে নেবে।

তিনি বলেন, ধানের শীষের প্রার্থীর পক্ষে দলের স্থানীয় নেতারা একাট্টা হয়ে মাঠে নেমেছেন। প্রতিদিন গণসংযোগ করছেন কেন্দ্রীয় নেতারা। আশেপাশের জেলার নেতারাও নারায়ণগঞ্জে বসবাসকারী এলাকার মানুষের মধ্যে প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন। এ সমন্বিত প্রচারণার ফলে ধানের শীষের প্রার্থী যে অনুকূল পরিবেশ পাচ্ছেন অন্তর্কোন্দলের কারণে নৌকার প্রার্থী সে পরিবেশ পাচ্ছেন না।

তিনি বলেন, নারায়ণগঞ্জে প্রকাশ্যে সন্ত্রাসের আস্ফালন নেই কিন্তু নীরবে যদি সেটা বজায় থাকে তবে ভোটাররা উৎসাহ হারিয়ে ফেলবে। এছাড়া ভোটবিহীন বর্তমান সরকার ও আজ্ঞাবহ নির্বাচন কমিশনের কাছে আমরা কোনো সুষ্ঠু নির্বাচন আশা করি না। তবে নারায়ণগঞ্জে এখন পর্যন্ত প্রশাসন ও কমিশনের যে ভূমিকা রয়েছে তার অর্ধেকও যদি নির্বাচনের দিন থাকে তবে বিএনপি প্রার্থীর বিজয় কেউ ঠেকাতে পারবে না। -এমজমিন

 

Facebook Comments
(Visited 1 times, 1 visits today)

মন্তব্য

আপনার ইমেইল গোপন থাকবে - আপনার নাম এবং ইমেইল দিয়ে মন্তব্য করুন, মন্তব্যের জন্য ওয়েবসাইট আবশ্যক নয়

*

Open

Close