শিয়া প্রশ্ন : ইউসুফ কারজাবি যেভাবে দেখেন

0 0

” শায়েখ কারজাবি শিয়াদের দ্বারা সুন্নী মুসলিম-সমাজে হস্তক্ষেপের বিরোধিতা করলেও পারমানবিক অস্ত্র অর্জনে তার অধিকারকে সমর্থন করেন। তাছাড়া ইরানের ওপর যকোন বহিঃশক্তির আগ্রাসনে তার পাশে দাঁড়াবার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। তিনি মনে করেন,‘ইরান মুসলিম উম্মাহের অংশ। তার পাশে দাঁড়াতে ইসলামই আমাকে উদ্বুদ্ধ করে। ”

বিংশ শতাব্দীতে সিরিয়ার ওহবাহ যুহাইলী থেকে ইউসুফ কারজাবি-সহ অনেকেই বৈশ্বিক পরিসরে মুসলিম উম্মাহর ঐক্য নিয়ে কাজ করার চেষ্টা করেছেন। শিয়াদের বিষয়ে ইউসুফ কারজাবির স্বতন্ত্র দৃষ্টিভঙ্গি বেশ খোলামেলাভাবে প্রথম প্রকাশিত হয় ২০০৮ সালে মিসরের একটি টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে। তবে বেশ আগেই শায়েখ কারজাবি “যাহিরাতুল গুলোউ ফিততাকফীর” গ্রন্থে মুসলমানকে কাফির সাব্যস্ত করার বাড়াবাড়ি, ফলাফল ও উত্তরণে করণীয় আলোচনা প্রসঙ্গে শিয়াদের বিষয়ও আলোচনা করেছেন।

তবে সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হওয়ার পর থেকে শিয়া-সমাজে ‘নিন্দার সম্মুখীন’ হন কারজাবি। এমনকি তার বন্ধু ও আন্তর্জাতিক মুসলিম স্কলার ফোরামের ভাইস প্রেসিডেন্ট শিয়া আলেম শায়েখ তাসখিরী দ্বারাও তিনি সমালোচিত হন। এই সমালোচনার খণ্ডনও শায়েখ কারজাবি থেকে এসেছে। খণ্ডনে শিয়া বিষয়ে তার দৃষ্টিভঙ্গি আরো স্পষ্ট হয়েছে। দেশ-বিদেশের বিভিন্ন ফোরামে সুন্নীদের শিয়াকরণ এবং সাহাবীদের গালমন্দকে রেড লাইন নির্ধারণ করে ঐক্য-প্রচেষ্টায় সচেষ্ট হন কারজাবি। এবং মধ্যপন্থী শিয়া ইমামিয়ারাও সাহাবীদের গালি দেওয়াকে অপছন্দ করেন বলে তিনি জানান। শিয়া প্রশ্নে ইউসুফ কারজাবির অবস্থান ও দৃষ্টিভঙ্গি দেখাতে চেষ্টা করেছি এই লেখায়।

এক. কিতাব, রাসূল ও কিবলার অভিন্নতা:‘প্রথমত আমি মুসলিম ‍উম্মাহর সকল মত ও পথের মানুষের ঐক্যে বিশ্বাস করি। এক কিতাব ও এক রাসূলের প্রতি বিশ্বাস রাখা এবং এক কিবলার দিকে ফেরার নাম মুসলিম উম্মাহ। উম্মাহর অংশ হওয়াতে কোন দলকে উম্মাহর ভেতর থেকে বের করে দেয়া যায় না। উম্মাহ তিয়াত্তর ভাগে বিভক্ত হওয়ার হাদিসে সকলকেই উম্মত হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। অকাট্য ও সম্পূর্ণভাবে যদি কেউ বের হয়ে যায়, তাকে উম্মাহর অংশ হিসেবে গ্রহণ করা হবে না। যতক্ষণ পর্যন্ত ব্যাখ্যার মাধ্যমে কোন মুসলিমকে ইসলামের গণ্ডিতে রাখা যায়, আমি তা রাখতে চাই। কাউকে ইচ্ছেমাফিক কাফির বলতে চাই না। মূলকথা মুসলিমকে ইসলামের ওপর রাখা, তার প্রতি সুধারণা রাখা এবং যতক্ষণ ব্যাখ্যা করা সম্ভব, ব্যাখ্যা করতে হবে।’

দুই. ৭৩ দল বনাম মুক্তিপ্রাপ্ত দলের ব্যাখ্যা:‘হাদীসের ভাষ্যমতে ৭৭টি দলের মধ্যে মাত্র একটি দল মুক্তিপ্রাপ্ত। সকল মত ও পন্থার মানুষ নিজেদের মুক্তিপ্রাপ্ত ও অন্যদের ভ্রান্ত দল হিসেবে দাবি করে। আমরা আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের অনুসারীরা বিশ্বাস করি, আমরাই মুক্তিপ্রাপ্ত দল। অন্যসকল দল বিদআত ও গোমরাহীতে রয়েছে। এর ভিত্তিতে শিয়াদের বিষয়ে আমার বক্তব্য- তারা বিদআতী। কাফির নয়। এটা আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের ঐক্যমত্য সিদ্ধান্ত। আলহামদুলিল্লাহ! মুসলিম উম্মাহর নয়-দশমাংশ আহলুস সুন্নাহর অনুসারী। আর আমাদের সম্পর্কে শিয়াদের যে বিশ্বাস তারা তা প্রকাশ করতেই পারে।’

তিন. আকীদাগত বিভ্রান্তি ও বর্তমান কুরআন বিষয়ে তাদের অবস্থান:‘শিয়া ইমামিয়াদের ব্যাপারে মধ্যপন্থী সকল আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের মতামত হলো তারা ভ্রান্ত। চরমপন্থী শিয়ারা কাফির। কুরআন, সুন্নাহ ও সাহাবাদের ব্যপারে শিয়াদের দৃষ্টিভঙ্গি, ইমামদের নিষ্পাপ হওয়া এবং গায়েব বিষয়ে নবীদের থেকে তাদের ইমামদের বেশী জানার বিষয়ও চরম আপত্তিকর। হ্যাঁ, তেহরান থেকে প্রকাশিত এবং কায়রো ও মদিনা থেকে প্রকাশিত কুরআনের মধ্যে কোন ফারাক নাই। তাদের উলামায়ে কেরাম এই কুরআনেরই তাফসীর করেন। আমি তাদের মাযহাবের মৌলিক ভিত্তির সাথে দ্বিমত পোষণ করি। শিয়াদের বক্তব্য, ‘নবী সা. তার পরবর্তী খেলাফতের জন্য আলী রা. এর অনুকূলে অসিয়ত করেছেন।

সাহাবায়ে কেরাম তা গোপন করেছেন। তারা রাসূলের সাথে খেয়ানত করে আলী রা.-কে তার অধিকার থেকে বঞ্চিত করেছেন। তারা তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করেছে।’ আশ্চর্য! আলী রা. এটা প্রকাশ্যে কখনো বলেননি। অধিকার আদায়ে লড়াই করেননি। বরং আবু বকর, উমর ও উসমান রা. এর হাতে বায়াতগ্রহণ করেছেন। তাদের সাহায্যকারী ও পরামর্শক হিসেবে কাজ করেছেন। আলী রা. কিভাবে তাদের সাথে সত্যের মুখোমুখি হলেন না? কেন নিজের অধিকারের কথা প্রকাশ্যে প্রকাশ করলেন না? কিভাবে তার সন্তান হাসান রা. হাদীসের বক্তব্য অনুসারে মুয়াবিয়া রা. এর অনুকূলে খেলাফত ছেড়ে দিলেন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, আল্লাহর রাসূল সা.তার বাণী ‘আল্লাহ তায়ালা তার (হাসান) দ্বারা উম্মাতের দুই বিরাট ও মহান দলের মধ্যে মিমাংসা করে দিবেন’ এর মাধ্যমে হাসান রা. কর্তৃক মুয়াবিয়ার অনুকূলে খেলাফত ছেড়ে দেয়ার প্রশংসা করেছেন।

তাছাড়া শিয়াদের কর্মগত বিদআত তো আছেই। যেমন- প্রতিবছর মুখে চপেটাঘাত করা ও বুক ছোরার আঘাতে রক্তাক্ত করার মাধ্যমে হুসাইন রা. এর ট্রাজেডির স্মরণ করা। এই ঘটনার তো তেরশত শতাব্দী গত হয়েছে। আলী রা. হাসান রা. থেকে উত্তম হওয়া সত্বেও কেন তার স্মরণে এমন করা হল না? আহলে বাইতের গোরস্থানে গিয়ে আল্লাহকে বাদ দিয়ে তাদের মাধ্যমে চাওয়া তাদের শিরকের অন্যতম। এই ধরণের আচরণ আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের অনুসারীদের মধ্যেও আছে। কিন্তু তাদের ইমামগণ কঠোরভাবে এর নিষেধ করেন। এসব কারণেই আমরা তাদেরকে বিদআতী বলি। তাদেরকে উম্মত থেকে বের করে দেয়ার মতো বড় কুফরীর বলে মনে করি না। বহু আগে থেকেই তাকফিরী তত্ত্বের প্রতিরোধ আমি করে আসছি। আমি আমার ‘যাহিরাতুল গুলুউ ফিত তাকফীর’ গ্রন্থ প্রকাশ করে এই বাড়াবাড়ির কঠোর বিরোধিতা করেছি। আমি বরং মনে করি, কালিমার সাক্ষ্য দেয় এবং তার অবশ্য দাবি পূরণ করে, সে নিশ্চিত ইসলামের অন্তর্ভূক্ত। সে নিশ্চিত ইসলাম হতে বের হবে না।’

চার. শাখাগত মতবিরোধ:‘শাখাগত, আমলগত এবং ইবাদাত-মুয়ামালাতের বিষয়ে মতভেদ থাকতেই পারে। আমাদের ও শিয়াদের মধ্যকার মতপার্থক্য আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের বিভিন্ন মাযহাবের পারষ্পারিক মতভেদের থেকে যে খুব বেশী কিছু, এমন নয়। এ জন্যই শায়খুল আযহার শায়েখ শালতুত থেকে শিয়াদের বর্ণনা আছে, ‘জা’ফরী মাযহাব অনুসারে ইবাদাত করা যাবে। কারণ, ইবাদাতে শাখাগত ও কর্মগত বিষয় সংশ্লিষ্ট।’ নামাজ ও রোজা ইত্যাদির বিষয়ে তাদের সাথে আমাদের যে পার্থক্য তা সহনীয়তার সাথে দেখা সম্ভব।’

পাঁচ. সাহাবীদের গালি ও শিয়াইজমের প্রচার-প্রসঙ্গ:‘আমার বক্তব্য খুবই স্পষ্ট, আয়াতুল্লাহ খামেনীর সাথে সাক্ষাতেও আমি বলেছি, কিছু বিষয় আমাদের নিকট ষ্পর্শকাতর, এটা কোনভাবে অতিক্রম করা যাবে না। সাহাবাদের গালি দেওয়া এবং সুন্নী দেশে শিয়াইজমের প্রচার। এ বিষয়ে প্রধান প্রধান শিয়া আলেমগণ আমাদের সাথে একমত পোষণ করেছেন। শিয়াদের অনেক বড় আলেম পর্যন্ত সাহাবায়ে কেরাম বিষয়ে কুধারণা পোষণ করেন। যদিও প্রকাশ্যে তাকিয়া করে কিছু বলেন না। আমরা বলতে চাই, সাহাবায়ে কেরাম সম্পর্কে কোন কুৎসা রটনা করলে আমরা চুপ থাকবো না। ‘

‘মিসর, সুদান, মরক্কো, আলজেরিয়া ও নাইজেরিয়াসহ আফ্রিকান দেশগুলোতে শিয়া মতবাদ প্রচারের চেষ্টা চলছে। সুন্নী অঞ্চলে শিয়াইজম প্রচার ভবিষ্যতে সশস্ত্র সংঘাত ডেকে আনতে পারে। খালেস ইসলামের দাওয়াত দিলে আমাদের কোন অসুবিধা নাই, যেমন সুন্নিরা ইসলামের দাওয়াত দেন, বিতর্কিত বিষয়গুলোকে দাওয়াতের মাধ্যম বা বিষয়বস্তু বানান না। অন্যদিকে শিয়ারা ইসলামের প্রাথমিক ইতিহাসে তাদের ওপর যে জুলুম হয়েছে, তার দায় বর্তমান সুন্নিদের ওপরেও চাপান, সুন্নিদের দমনকে ঐতিহাসিক সংগ্রামের সফলতা হিসেবে দেখেন। এগুলো অত্যন্ত ভয়ঙ্কর ব্যাপার। এভাবে সুন্নি দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশের সাথে সংঘাত বেঁধে যায়। ‘

সিরিয়া ও ইরাকে বিপর্যয়ের পর আল জাজিরা ও আল হিওয়ার টিভিতে সাক্ষাৎকারে শায়েখ কারজাবি আক্ষেপ করে বলেন, তিনি আগে থেকেই এর আশঙ্কা করছিলেন। ইরাক ও সিরিয়ান ডেমোগ্রাফিক পরিবর্তনকে শিয়া-সাম্প্রদায়িকতার ফল বলে আখ্যা দেন। তিনি বলেন, সুন্নিরা এমন ডেমোগ্রাফিক পরিবর্তনের সাথে জড়িত নন। পাশাপাশি তিনি তথ্য দিয়ে দেখান যে, সুন্নি রাষ্ট্রে শিয়ারা রাজনৈতিক পদে থাকলেও ইরানে ও অন্য কোন শিয়া রাষ্ট্রে সুন্নিদের সাথে সমন্বয় করে রাজনীতি করার কোন পরিস্থিতি বা পরিবেশ নেই। তার বক্তব্য মতে, তেহরানে সুন্নি মসজিদ নির্মাণের কোন অনুমতি দেওয়া হচ্ছে না।

শেষকথা:শায়েখ কারজাবি শিয়াদের দ্বারা সুন্নী মুসলিম-সমাজে হস্তক্ষেপের বিরোধিতা করলেও পারমানবিক অস্ত্র অর্জনে তার অধিকারকে সমর্থন করেন। তাছাড়া ইরানের ওপর যকোন বহিঃশক্তির আগ্রাসনে তার পাশে দাঁড়াবার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। তিনি মনে করেন,‘ইরান মুসলিম উম্মাহের অংশ। তার পাশে দাঁড়াতে ইসলামই আমাকে উদ্বুদ্ধ করে।’

Leave A Reply