ব্রেকিং নিউজঃ হঠাৎ যে কারণে ব্রিটেনে দাস ব্যবসায়ীদের মূর্তি উচ্ছেদের জোয়ার

0 8

আমেরিকার বর্ণবাদ বিরোধী আন্দোলনের ছোঁয়া লেগেছে ব্রিটেনেও। আর সেই ছোয়ায় ব্রিটেন তথা যুক্তরাজ্যের প্রতিটি রাজ্যের প্রতিটি শহরে বর্ণবাদবিরোধী বিক্ষোভ থেকে দাস ব্যবসায় জড়িতদের মূর্তি অপসারণের জোয়ার উঠে। ওই জোয়ারের ধাক্কায় প্রথমে গত বোরবার ব্রিস্টলে ১৭ শতকে নির্মিত ইংরেজ দাস ব্যবসায়ী এডওয়ার্ড কলস্টনের মূর্তি ভেঙ্গে পাশের হারবার নদীতে ফেলে দেয় বিক্ষোভকারীরা। রোববারের ওই ঘটনার পর ব্রিটেনের প্রতিটি রাজ্যের বিভিন্ন শহরে স্থাপিত বিতর্কিত ক্রীতদাস ব্যবসায়ী, উপনিবেশ স্থাপনকারী, বর্ণবাদীদের মূর্তি উচ্ছেদের দাবিতে সোচ্ছার হয়েছেন বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের আয়োজকরা।

লন্ডন:বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের আয়োজকদের সাথে একাত্মতা প্রকাশ করেন ইংল্যান্ডের রাজধানী লন্ডনের মেয়র সাদিক খান। শুধু একাত্মতা প্রকাশ করেই বসে থাকেননি লন্ডন মেয়র। এজন্য তিনি একটি কমিশন গঠন করেছেন। বিতর্কিত ক্রীতদাস ব্যবসায়ীদের মূর্তি ও নাম ফলক উচ্ছেদ এবং স্ট্রিটের নাম পরিবর্তনের ব্যাপারে ওই কমিশন পর্যালোচনা করে রিপোর্ট দিবে। রিপোর্টের ভিত্তিতে ১৬ ও ১৭ শতকের বেশ কয়েকজন বড় দাস ব্যবসায়ীর মূর্তি ও নাম ফলক উচ্ছেদ ও তাদের নামে করা স্ট্রিটের নাম পরিবর্তনের নির্দেশ দিয়েছেন লন্ডন মেয়র সাদিক খান। তবে এই পর্যালোচনার ভেতরে স্যার উইন্সটন চার্চিলের মূর্তি থাকবে না বলে নিশ্চিত করেছেন লন্ডন মেয়র সাদিক খান। লন্ডনে ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার বিক্ষোভের সময় লন্ডনে ক্ষুব্ধ বিক্ষোভকারীদের রোষানলে পড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয় সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী স্যার উইন্সটন চার্চিলের মূর্তিও।

ব্রিস্টল:ব্রিস্টলে ১০ হাজার মানুষের বিক্ষোভ থেকে ১৭ শতকের ইংরেজ দাস ব্যবসায়ী এডওয়ার্ড কলস্টনের মূর্তি ভেঙ্গে পাশের হাবার নদীতে ফেলে দিয়েছে বিক্ষোভকারীরা। ১৬৩৬ সালে ব্রিস্টলের ধনাঢ্য পরিবারের জন্ম নেয়া কলস্টন কর্মজীবনে রয়েল আফ্রিকান কোম্পানির ডেপুটি গভর্নর হিসেবে কাজ করতেন। ওই সময় ওই কোম্পানির অধীনে অন্তত ৮০ হাজার কৃষ্ণাঙ্গ আফ্রিকানকে আমেরিকায় দাস হিসেবে পাচার করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। পাচারের সময় ৩ হাজার শিশুসহ অন্তত ২০ হাজার আফ্রিকানের মৃত্যু হয়েছে। জীবনের শেষ দিকে এসে অর্থাৎ ১৭১০ সালে তিনি কনজারভেটিভ পার্টির এমপি নির্বাচিত হয়েছিলেন। ১৭২১ সালে মারা যান তিনি।

১৮৯৫ সালে ব্রিস্টল সিটি সেন্টারের সামনে তার মৃর্তি স্থাপন করা হয়। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দাস ব্যবসায়ী এডওয়ার্ড কলস্টনের মূর্তি নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক শুরু হয়। মূর্তিটি ভেঙ্গে ফেলার জন্য এরই মধ্যে প্রায় ১১ হাজার স্বাক্ষর পড়েছে একটি পিটিশনে। অবশেষে রোববার বিক্ষোভকারীরা মূর্তিটি টেনে নামিয়ে উল্লাস করেছে এবং সেটির ঘাড়ের ওপর এক বিক্ষোভকারীকে হাটু চেপে থাকতেও দেখা গেছে, ঠিক যে কায়দায় পুলিশ ফ্লয়েডের ঘাড়ে হাটু চাপা দিয়েছিল। পরে মূর্তিটি টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে গিয়ে নদীতে ফেলা হয়।

টাওয়ার হ্যামলেটস:ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার আন্দোলনের ওই প্রতিবাদী জোয়ারে লন্ডনের বাংলাদেশী অধ্যুষিত টাওয়ার হ্যামলেটসের ডকল্যান্ড মিউজিয়ামের সামনে স্থাপিত রবার্ট মিলিগানের মূর্তিটি মঙ্গলবার কাউন্সিলের উদ্যোগে উচ্ছেদ করা হয়। মঙ্গলবার বিকালে মেয়র জন বিগসের নির্দেশে এই মূর্তিটি ওয়েস্ট ইন্ডিয়া কিম্বর মিউজিয়াম অব ডকল্যান্ডের সামনে থেকে সরানো হয়। মূর্তিটি সরানোর সময় মেয়র জন বিগস উপস্থিত ছিলেন।

রবার্ট মিলিগানের মূর্তিটি ১৮১৩ সালে স্থাপন করা হয়। সে সময় ওয়েস্ট ইন্ডিয়া কিম্বর ডেভেলাপমেন্টে তার ভূমিকার জন্য এটি স্থাপন করা হয়েছিলো। তার নামে লাইম হাউজে একটি রোডের নামও রয়েছে। ১৭৪৬ সালে স্কটল্যান্ডে জন্মগ্রহণকারী ধনাঢ্য মিলিগান দাস ব্যবসার সাথে জড়িত ছিলেন তিনি। তিনি তার বিভিন্ন ব্যবসায় দাসদের নিয়োগ দিতেন। জ্যামাইকাতে তার একটি সুগার কোম্পানীতে ৫২৬ জন দাস কাজ করতো। সুগার ছাড়াও তার কফি এবং জাহাজের ব্যবসা ছিলো।

মিলিগান ১৮০৯ সালে মৃত্যুবরণ করেন। মঙ্গলবার মূর্তিটি সরানোর পর মেয়র জন বিগস তার প্রতিক্রিয়ায় বলেন, মিলিগানের মূর্তির ব্যাপারে আমাদের অনেকের মধ্যেই অস্বস্তি ছিলো। ব্রিস্টলের ঘটনার পর বাসিন্দাদের এই উদ্বেগ এবং জননিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে আমরা মূর্তিটি দ্রুত সরানোর উদ্যোগ নেই। মেয়র আরো বলেন, ইস্ট এন্ডে বর্ণবাদ এবং বৈষম্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ঐতিহ্য রয়েছে। এধরনের ইতিহাস এবং এর প্রতীকগুলোকে আমরা কিভাবে মোকাবেলা করবো তার জন্য আরো ব্যাপক আলোচনার প্রয়োজন রয়েছে।

লিডসে রানী ভিক্টোরিয়ার মূর্তি: শুধু দাস ব্যবসায়ীরাই নয় বর্ণবাদের অভিযোগ থেকে রক্ষা পাননি ব্রিটেনের সাবেক রানী ভিক্টোরিয়াও। ব্রিটেনের লিডস শহরের হাইড পার্কে স্থাপন করা রানী ভিক্টোরিয়ার একটি মূর্তিতে গ্রাফিতি এঁকে দিয়ে তাতে ‘খুনি’ ও ‘দাস মালিক’ লিখে দিয়েছে বিক্ষোভকারীরা। ব্রোঞ্জের ওই মূর্তিতে ‘উপনিবেশ স্থাপনকারী’ ও ‘বর্ণবাদী’ শব্দও লিখে দেয়া হয়েছে। হাইড পার্কে আক্রান্ত হওয়া রানী ভিক্টোরিয়ার মূর্তিটি ১৯০৫ সালে উন্মোচন করা হয়।

প্রথমে লিডস টাউন হলের বাইরে স্থাপন করা হলেও ১৯৩৭ সালে এটি হাইড পার্কে সরিয়ে নেয়া হয়। দাসপ্রথা বিলোপ আইন পাস হওয়ার পর ১৮৩৭ সালে ব্রিটিশ সিংহাসনে বসেন রানী ভিক্টোরিয়া। ১৯০১ সালে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সিংহাসনে থাকা অবস্থায় ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ব্যাপক বিস্তার প্রত্যক্ষ করেন। ১৮৭৭ সালের ২ জানুয়ারি তিনি ভারতের সম্রাজ্ঞী হন। তার অনুমোদিত সাম্রাজ্যবাদী নীতির মাধ্যমেই দুনিয়ার সবচেয়ে বড় উপনিবেশিক শক্তিতে পরিণত হয় ব্রিটেন।

ইউনিভার্সিটি অব ইস্ট লন্ডন:পূর্ব লন্ডনের ইউনিভার্সিটি অব ইস্ট লন্ডন থেকে বুধবার দাস ব্যবসায়ী স্যার জন ক্যাসের মূর্তি অপসারণ করা হয়েছে। তার জন্ম ১৬৬০ সালে এবং মৃত্যু ১৭১৮ সালে। আর্ফিকান এবং ক্যারিবিয়ান দাস ব্যবসায়ী হিসেবে কাজ করেছেন তিনি। ব্রিটেনে শিক্ষাখাতে তার ব্যাপক অবদান থাকলেও সারাদেশে দাস ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে ক্ষোভ জেগে উঠলে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ওই সিদ্ধান্ত নেয়।

অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি:এছাড়া অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি গেইটের সামনে স্থাপিত সাম্রাজ্যবাদী সেসিল রডিসের মূর্তি উচ্ছেদের জন্য অক্সফোর্ডের ২৬ জন কাউন্সিলর এবং এমপি আহ্বান জানিয়েছেন। ইউনিভার্সিটির ওরিয়েল কলেজের সামনে শত শত শিক্ষার্থী দাস ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচিত সেসিল রডিসের মূর্তি অপসারনের দাবিতে বিক্ষোভ করে বুধবার।

শ্রুজবেরিতে ক্লাইভের মূর্তি:এদিকে পশ্চিম ইংল্যান্ডের শ্রুজবেরিতে অবস্থিত রবার্ট ক্লাইভের একটি মূর্তি অপসারণের দাবি জানিয়ে খোলা অনলাইন পিটিশনে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে স্বাক্ষরকারীর সংখ্যা হাজার ছাড়িয়ে গেছে। পিটিশনের আবেদনকারীরা ভারতবর্ষে ব্রিটিশ উপনিবেশ প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা ক্লাইভের ওই মূর্তিকে ‘উপনিবেশিকতার প্রতীক’ অ্যাখ্যা দিয়েছেন। চেইঞ্জ ডট অর্গের মাধ্যমে করা পিটিশনটিতে শ্রপশার শহর কর্তৃপক্ষকে মূর্তিটি অপসারণে ব্যবস্থা নিতে অনুরোধ করা হয়েছে বলে জানিয়েছে ভারতীয় ইংরেজি দৈনিক স্টেটসম্যান।

“ভারতবর্ষ, বাংলা এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বেশিরভাগ অংশে ব্রিটিশ উপনিবেশের শুরুর দিককার গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র রবার্ট ক্লাইভ,” পিটিশনে লর্ড ক্লাইভকে এভাবেই চিত্রিত করা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে এ অনলাইন আবেদনে আড়াই হাজার মানুষের স্বাক্ষর সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও, খোলার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সেটি এক হাজার সাত শ’রও বেশি মানুষকে আকৃষ্ট করে।

“ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকতার প্রতীক ক্লাইভের এই মূর্তিটি ভারতীয়, বাঙালি ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ভাষাভাষীদের জন্য খুবই অবমাননাকর। একে ব্রিটিশদের গর্ব ও জাতীয়তাবাদের স্মারক হিসেবে ন্যায্যতা দেয়ার চেষ্টা করা হয়। লাখ লাখ নিরপরাধ মানুষকে হত্যা ও নির্যাতন যারা উপভোগ করতে পারে, কেবল তাদের কাছেই এটি ন্যায্যতা পেতে পারে,” পিটিশনে এমনটাই বলা হয়েছে। অষ্টাদশ শতকে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দখলে থাকা বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির প্রথম গভর্নরের দায়িত্ব পালন করেন রবার্ট ক্লাইভ; পান ‘ভারতের ক্লাইভ’ খেতাব। পিটিশনে ভারতে ব্রিটিশ উপনিবেশ স্থাপনের শুরুর দিকে বাংলা অঞ্চলে‘লুটপাটে’ ক্লাইভের ভূমিকার কথা তুলে ধরা হয়।

লিভারপুল:ইংল্যান্ডের লিভারপুলের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উইলিয়াম গ্লেডস্টোন এর মূর্তি সরানোর দাবিতে আন্দোলন করছে স্থানীয়রা। আর লিভারপুলের এল-১৮ এ একটি স্ট্রিটের নাম পেনি লেন। এর নামকরণ করা হয় জেমস পেনীর নামে। জেমস পেনি দাস ব্যবসার সাথে জড়িত ছিলেন। এই অভিযোগে স্থানীয় কে বা কারা ওই স্ট্রিটের নামের উপর কালো কালি দিয়ে ঢেকে দিয়েছে।

নর্দার্ন আয়ারল্যান্ড , স্কটল্যান্ড ও ওয়েলস:ইংল্যান্ড ছাড়াও ব্রিটেনের বাকি তিন রাজ্য হচ্ছে নর্দার্ন আয়ারল্যান্ড, স্কটল্যান্ড ও ওয়েলস। ওসব রাজ্যের বিভিন্ন শহরেও দাস ব্যবসার সাথে জড়িত ছিলো এমন অভিযোগে বিভিন্ন স্বনামধন্য ব্যক্তির মূর্তি অপসারনের জন্য উদ্যোগ নিয়েছে স্থানীয়রা। নর্দার্ন আয়ারল্যান্ড-এর নিউয়ারি থেকে জন মিচেলের মূর্তি অপসারণের দাবিতে আন্দোলন করছে স্থানীয়রা।

ওদিকে স্কটল্যান্ডের এডিনবার্গে ১৮২৭ সালে দাস ব্যবসায়ী হেনরি ডানডাসের মূর্তিটি অপসারণের জন্য অনলাইনে পিটিশন করে তা উচ্ছেদের উদ্যোগ নিয়েছে স্থানীয় জনগণ। ওয়েলসের রাজধানী কার্ডিভ-এর সিটি হল থেকে ১৯ শতকের দাস ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচিত স্যার থমসন পিকটন-এর মূর্তি অপসারণের উদোগ নিয়েছে কর্তৃপক্ষ।কার্ডিভের মেয়র লর্ড ডান দিয়াথ ও কাউন্সিল লিডার হু টমাস তাদের কাউন্সিল সহকর্মীদের কাছে স্যার টমসন পিক টনের মূর্তি অপসরণে সহায়তা করার আহবান জানিয়েছেন।

Leave A Reply