যেভাবে ডিজিটাল আইনের অপপ্রয়োগ বেড়েই চলছে!

0 6

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অপপ্রয়োগ বাড়ছে। বিগত বছরের চেয়ে চলতি বছরের ছয় মাসে এ আইনে মামলার সংখ্যাও আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। এ বছর এ আইনে যতগুলো মামলা হয়েছে তার আসামিদের প্রায় ২৫ শতাংশই সাংবাদিক। তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত এসব মামলায় ৫২ জন গ্রেফতার হয়েছেন, যার মধ্যে ১২ জনই সাংবাদিক। অথচ বেশির ভাগ মামলায় আসামিদের অপরাধের সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা নেই।

আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডিজিটাল আইনের অপব্যবহারের প্রকৃত চিত্র আরো ভয়াবহ। এভাবে আইনের প্রয়োগ এবং অপব্যবহার অসহিষ্ণুতার লক্ষণ। তাই এই আইন বিলুপ্ত হওয়া উচিত। তাদের মতে, অব্যবস্থাপনার বিরুদ্ধে কথা বলা ও তথ্য প্রকাশে কণ্ঠরোধ করার যে প্রক্রিয়া চালু হয়েছে তা কোনোভাবেই মেনে নেয়ার মতো নয়। তাই এই আইন বাতিল বা সুরক্ষার বিধান করা উচিত। বাকস্বাধীনতার সাথে এই আইন সাংঘর্ষিক। তাই লেখালেখি, মতপ্রকাশের বিষয়গুলো এই আইনের বাইরে নেয়া উচিত। সব বিবেচনায় যদি আইনের বিলুপ্তি অসম্ভব হয় তবে বিপজ্জনক ধারাগুলো বাদ দিতে হবে। নয়তো এর অপব্যবহার রোধ অসম্ভব।

মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তথ্য মতে, ২০১৮ সালের ৯ অক্টোবর থেকে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন (ডিএসএ) কার্যকর রয়েছে। আর্টিকেল ১৯-এর হিসাব অনুযায়ী, এ বছরের জুন পর্যন্ত মোট মামলা হয়েছে ১০৯টি। তুলনামূলক বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০১৯ সালে মোট মামলা হয়েছে ৬৩টি। আর সেখানে চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসেই মামলা ১০৯টি। এই সব মামলায় মোট আসামি ২০৬ জন। তাদের মধ্যে সাংবাদিক ৪৬ জন, আর অন্যান্য পেশায় কর্মরত ও সাধারণ মানুষ ১৬০ জন। এই হিসাবে প্রায় ২৫ ভাগ আসামিই হলেন সাংবাদিক।

এর মধ্যে জানুয়ারি মাসে ১০, ফেব্রুয়ারিতে ৯, মার্চে ১৩, এপ্রিলে ২৪, মে মাসে ৩১ এবং জুনে ২২টি মামলা হয়েছে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে। আর্টিকেল ১৯ বলছে, গত বছর ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা হয়েছে ৬৩টি। ২০১৮ সালে ডিএসএ এবং আইসিটি অ্যাক্ট মিলিয়ে মামলা হয়েছে ৭১টি। করোনা নিয়ে ‘গুজব’, মন্ত্রী, এমপি বা ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের নিয়ে ‘মিথ্যা সংবাদ’ ফেসবুকে স্ট্যাটাস, ‘মিথ্যা তথ্য ছড়ানো’, চিকিৎসা নিয়ে সমালোচনা, ‘ত্রাণ চুরির মিথ্যা খবর’, ধর্মের অবমাননা, প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে কটূক্তি, বঙ্গবন্ধু, মুক্তিযুদ্ধ, ‘রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতে অপপ্রচার’, ত্রাণ নিয়ে দুর্নীতি, পুলিশে ঘুষের ঘটনাসহ নানা অভিযোগে সাংবাদিকসহ অন্যদের বিরুদ্ধে এসব মামলা করেছেন পুলিশ, প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল বা তাদের সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা।

সাইবার ক্রাইম ট্রাইব্যুনালের তথ্যানুযায়ী, এই বছরের মার্চ পর্যন্ত ডিজিটাল আইনে মামলা হয়েছে মোট ৩২৭টি। জানুয়ারি মাসে মামলা হয়েছে ৮৬টি। এর মধ্যে থানায় ৪১টি এবং আদালতে ৪৫টি। ফেব্রুয়ারি মাসে হয়েছে ১১৯টি। থানায় ৯৫টি এবং আদালতে ৩৪টি। মার্চ মাসে মামলা হয়েছে ১২২টি। এর মধ্যে থানায় ৭৫টি এবং আদালতে ৩৭টি। ২০১৯ সালে মোট মামলা হয়েছে এক হাজার ১৮৯টি। এর মধ্যে থানায় ৭২১টি এবং আদালতে ৪৬৮টি। ২০১৩ সাল থেকে এ পর্যন্ত ৫৫০টির মতো মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে।

বিচারাধীন মামলা আছে মোট এক হাজার ৯৫৫টি। এর মধ্যে থানায় দায়ের করা এক হাজার ৬৬৮টি এবং আদালতে ২৮৭টি। ৫৫টি মামলা হাইকোর্টের নির্দেশে স্থগিত আছে। তথ্য মতে, মোট মামলার ৭৫ ভাগই নারী ভিকটিমদের করা। তবে তা আলোচনায় আসে না বা তাদের তথ্য প্রকাশ পায় না। বাকি মামলাগুলো রাজনৈতিক নেতা, প্রভাবশালী ব্যক্তি বা করপোরেট প্রতিষ্ঠানের করা। তাদের মধ্যে প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী বা এমপিদের পক্ষ হয়ে অনেকেই মামলা করেন। এ বিষয়ে কয়েকজন বিশিষ্ট আইন ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক তাদের অভিমত দিয়েছেন।

আসিফ নজরুল : বিরাজমান পরিস্থিতিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক, সংবিধান বিশেষজ্ঞ, কলামিস্ট, রাজনীতি-বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. আসিফ নজরুল জানিয়েছেন, এ আইনের অপব্যবহারের প্রকৃত চিত্র আরো ভয়াবহ। তার মতে, ‘এটা সবচাইতে কালো একটা আইন। এই আইনে সব অপরাধকে এমনভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে যাতে যে কেউ ইচ্ছামত এর সুযোগ নিয়ে অন্য লোকের বিরুদ্ধে মামলা করতে পারে। এই ধরনের আইনের চরম অপব্যবহারের সুযোগ থাকে।’ তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত আমরা দেখি এর চরম অপব্যবহার করা হচ্ছে। সরকারের পক্ষে তা করা হচ্ছে। সরকারের যারা সমালোচক যারা ভিন্নমত পোষণ করে, সামান্যতম সমালোচনা করলেও সেটার বিরুদ্ধে তা করা হচ্ছে। এটা আমরা প্রথম থেকে দেখে আসছি।

করোনা পরিস্থিতিতে এটাকে যেভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে তা অত্যন্ত বেদনাদায়ক। এ রকম পরিস্থিতিতে সরকারগুলো আরো মানবিক আচরণ করে। অথচ এ রকম পরিস্থিতিতে এ আইনের অপপ্রয়োগে আমার কাছে মনে হয় যে সরকার তার ব্যর্থতা, অপকর্ম, শৈথিল্য ঢাকার জন্য নাগরিকদের সাথে প্রচণ্ড আগ্রাসী ও নির্দয়ের মতো আচরণ করছে। আসিফ নজরুল বলেন, এটা খুবই দুঃখজনক যেখানে মানুষ ঠিকমতো স্বাস্থ্যসেবা পাচ্ছে না, রাস্তায় রাস্তায় ঘুরছে, মারা যাচ্ছে, ঠিকমতো একটা টেস্ট করাতে পারছে না, কর্মসংস্থান ঠিকমতো নেই, স্বাস্থ্যসেবার দৈন্যদশা এমন পরিস্থিতিতে মানুষের মধ্যে ক্ষোভ থাকা স্বাভাবিক। কিন্তু মানুষ ক্ষুব্ধ হয়ে একটা কথাও বলতে পারছে না। কারণ সরকারের আচরণে মনে হচ্ছে, সেটাও এই আইন দিয়ে ধরা হবে। তার মানে কোনোভাবে কিছু বলতেই দেবে না। তিনি বলেন, সরকার স্বাস্থ্য খাতে এত ব্যর্থতা দেখিয়েছে যেখানে প্রচণ্ড যৌক্তিকভাবে সমালোচনা করার প্রচুর জায়গা আছে।

এ পরিস্থিতিতে যেখানে সরকার মানুষের প্রতি সহানুভূতি নিয়ে দাঁড়াবে সেখানে উল্টো রুদ্র্র দানবের মতো আবির্ভূত হয়েছে। এটা খুবই বেদনাদায়ক যে দেশে আইন আদালত রয়েছে, মানবাধিকার সংস্থা রয়েছে, গণমাধ্যম রয়েছে সে দেশে কী করে এমন একটা আইন থেকে যায়। তার মতে, এ রকম চোখে আঙুল দিয়ে একের পর এক অপপ্রয়োগ হচ্ছে। মানুষকে শ^াস নিতে দেয়া হচ্ছে না। এরপরও এ আইন টিকে থাকে কিভাবে? সরকারের জন্য অত্যন্ত লজ্জার যে তারা এটাকে উপলব্ধি করতে পারছে না। ক্ষোভ, ক্রোধ, আপত্তি প্রকাশ করার উপযুক্ত মাধ্যম এখন দেশে নেই বলে বোঝা যাচ্ছে না মানুষ কত বেশি অতিষ্ঠ এবং ক্ষুব্ধ। তিনি মনে করেন, ‘আইন বিলুপ্ত না করলেও এই আইনের নিবর্তনমূলক ধারাগুলো অবশ্যই বিলোপ করা উচিত। বিশেষ করে মানহানির মামলাতে স্পষ্ট করে বলা উচিত যে যার মানহানি হয়েছে বলে মনে হয় সে মামলা করবে। অন্য কেউ মামলা করতে পারবে না।’

মনজিল মোরসেদ : মানবাধিকার ও পরিবেশবাদী সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের সভাপতি সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মনজিল মোরসেদ জানান, এ আইনের অপপ্রয়োগে ইতোমধ্যে আদালত একটি রুল জারি করেছেন। কারণ এর দ্বারা দেশের সাধারণ নাগরিক থেকে শুরু করে গণ্যমান্য ব্যক্তিরাও হয়রানি ও আটক হয়েছেন। তিনি বলেন, সম্প্রতি ইনকিলাব সম্পাদকের বিরুদ্ধেও এ আইনে মামলা হয়েছে। এর আগে ব্যারিস্টার মইনুল হোসেনের মতো ব্যক্তিরাও এ মামলায় আটক হয়েছেন। তিনি বলেন, এ ধারার অধিকাংশ মামলার বাদি হচ্ছেন আওয়ামী লীগ কর্মীরা। যারা দলে ফায়দা হাসিলের উদ্দেশ্যে মামলাগুলো করছেন।

কারণ যাকে নিয়ে কথাগুলো বলা হয় বা সংবাদ প্রকাশ হয় দেখা যায় তিনি হয়তো জানেনই না অথচ তার হয়ে অন্যজন মামলা করেছে। এ বিষয়টি সবচাইতে ভয়াবহ। আইনের অপপ্রয়োগটা এখানেই হচ্ছে। তিনি বলেন, তাই এই আইন বাতিল বা সুরক্ষার বিধান করা উচিত। বাকস্বাধীনতার সাথে এই আইন সাংঘর্ষিক। লেখালেখি, মতপ্রকাশ বিষয়গুলো এই আইনের বাইরে নেয়া উচিত। তবে ডিজিটাল মাধ্যমে নাগরিকদের সত্যিকারের হয়রানি ও মানহানির প্রতিকারের ব্যবস্থাও থাকা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি। তার মতে, ডিজিটাল আইনের ২৫, ২৮ ও ২৯ ধারায় মামলা বেশি হয়। এই ধারাগুলো মানহানি, ধর্মের অবমাননা এবং গুজব ছড়িয়ে রাষ্ট্রের ক্ষতি করার অপরাধ। কিন্তু এসব অপরাধ সুনির্দিষ্টভাবে ব্যাখ্যা করা নেই। লিখেছেন আবুল কালাম,নয়া দিগন্ত থেকে সংগ্রহীত

Leave A Reply