রাসূল (সা.)-এর দাওয়াত দানের পদ্ধতি

0 12

মানুষকে পথ দেখানো আল্লাহপাকেরই দায়িত্ব। তিনি মানুষকে তাঁর নিজের প্রতিনিধি এবং ভালো-মন্দ পার্থক্য করার মতো বিবেক-বুদ্ধি দিয়ে সমগ্র সৃষ্টির ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন। তারপরও সঠিক পথের দিশাদানের লক্ষ্যে তাঁর নিজের পক্ষ থেকে অসংখ্য নবী-রাসূলকে হেদায়াতসহ যুগে যুগে প্রেরণ করেছেন। এটা মূলত প্রথম মানুষ আদম (আ.)-কে দেয়া তাঁর প্রতিশ্রুতিরই অংশ। মানুষের আদি বাসস্থান জান্নাত। শয়তানের প্ররোচনায় আল্লাহর নাফরমানি করার কারণে আদম ও শয়তান উভয়কেই পরীক্ষাস্বরূপ একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য এ দুনিয়ায় পাঠানো হয়। এটি মূলত কোনো শাস্তিভোগের জায়গা নয়, একটি পরীক্ষার স্থান এবং উত্তীর্ণ হতে পারলে আবার জান্নাতে স্থায়ীভাবে বসবাস করতে পারবে। পৃথিবীতে চলে আসার সময় ভীতসন্ত্রস্ত আদম (আ.)-কে আল্লাহপাক অভয় বাণী শুনিয়েছিলেন, ‘আমার পক্ষ থেকে যে হেদায়াত যাবে যারা তা অনুসরণ করবে তাদের কোনো ভয়ের কারণ নেই।’ তাঁরই প্রতিশ্রুতি মোতাবেক সর্বশেষ নবী ও রাসূল হলেন আমাদের প্রিয়তম নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)।

মূলত মানুষ যখন গোমরাহীর চরম সীমায় উপনীত হয়, তখনই পথ প্রদর্শনের জন্য আল্লাহপাক নবী পাঠান। মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর আগমনকালীন অবস্থা ছিল অন্ধকারাচ্ছন্ন। মারামারি-হানাহানি, যুদ্ধ-বিগ্রহ, খুন-ধর্ষণ, চুরি-ডাকাতি-ছিনতাই, ধোঁকা-প্রতারণা, আমানতে খেয়ানত, ওয়াদা-প্রতিশ্রুতি ভঙ্গসহ সব ধরনের অপরাধ সে সমাজে চালু ছিল। সেই সমাজে নারী জাতি ছিল চরম অবহেলিত, কন্যাসন্তান জন্মগ্রহণকে তারা অপমান মনে করতো এবং অনেক সময় কন্যাসন্তানকে জীবন্ত কবর দিত। সমাজে দাসপ্রথা চালু ছিল এবং হাটবাজারে গরু-ছাগলের মতো মানুষ কেনাবেচা হতো। সারা বিশ্বের চিত্র এমনই ছিল। সে সময়ে সুপার পাওয়ার হিসেবে বিবেচিত রোমান ও পারস্য সাম্রাজ্যে রাজতান্ত্রিক স্বৈরশাসন জারি ছিল। আর আরবে কোনো রাষ্ট্রীয় একক শাসন ছিল না; সেখানে নানা গোত্র ও বংশে মানুষ বিভক্ত ছিল এবং একে অপরের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রাখার লড়াই-এ সর্বক্ষণ লিপ্ত থাকতো। এমন অবস্থায় মানুষের হেদায়াতের জন্য আল্লাহপাক তাঁর প্রিয়তম ও সর্বশেষ নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-কে পাঠান। মক্কা নগরীর বিখ্যাত কুরাইশ বংশে জন্মগ্রহণ করে তিনি সেই সমাজে দীর্ঘ ৪০ বছর অতিবাহিত করেন। স্বভাব-চরিত্র, আচার-আচরণে অন্যদের থেকে তিনি ছিলেন ব্যতিক্রম।

মানবজীবনের সকল সৎ গুণাবলীর সমাবেশ ঘটেছিল তাঁর মধ্যে। সততা ও বিশ্বস্ততার কারণে তিনি আল আমিন ও আস সাদিক উপাধীতে ভূষিত হন। জনগণের আমানতের সংরক্ষক ও বিবাদ-বিসংবাদের তিনি ছিলেন মীমাংসাকারী। মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে সমাজের অনাচার দূরীকরণে তিনি সচেষ্ট ছিলেন এবং যুবক বয়সে হিলফুল ফুজুল গঠন করে মজলুমের সহায়তায় এগিয়ে আসেন। নবী হওয়ার পূর্বে তিনি ছিলেন তাঁর জাতির সবচেয়ে সম্মানীয় ও মর্যাদাবান ব্যক্তি। সমাজ নিয়ে তিনি ভাবতেন, মানুষের দুঃখ-কষ্ট, ব্যথা-বেদনায় ব্যথিত হতেন। এক পর্যায়ে তিনি লোকালয় থেকে আলাদা হয়ে ধ্যানমগ্ন থাকেন। হেরা গুহায় ধ্যানমগ্ন অবস্থায় তাঁর ওপর অহি অবতীর্ণ হয়। তিনি পথের দিশা পান। আল্লাহর পক্ষ থেকে মানুষকে সতর্ক করার জন্য ডাক আসে।

সমাজের কোনো সমস্যাকে পুঁজি করে তিনি মানুষকে ডাক দেননি। না পুরুষের বিরুদ্ধে নারীকে, না ধনীর বিরুদ্ধে দরিদ্রকে, না মনিবের বিরুদ্ধে দাসকে উস্কিয়ে তাদের একত্রিত করেননি। বরং হাজারো সমস্যা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে তিনি মানুষকে আহ্বান জানান, ‘হে দুনিয়ার মানুষ! তোমরা বলো, আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই (লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ), তাহলেই তোমরা সফলকাম হবে।’ এ দাওয়াত শুধু তিনি একা দেননি, বরং আল্লাহর পক্ষ থেকে যত নবী-রাসূল এসেছেন সবারই দাওয়াত অভিন্ন ছিল। এই দাওয়াত যিনি পেশ করেছেন এবং যাদের কাছে পেশ করা হয়েছে সবাই এর মর্ম বুঝতো। তাই তার প্রতিক্রিয়াও ছিল তাৎক্ষণিক। প্রথমে তিনি গোপনে দাওয়াত পেশ করেন এবং পরবর্তীতে আল্লাহর নির্দেশ আসে নিকটবর্তী আত্মীয়-স্বজনকে সতর্ক করার জন্য। গোপন দাওয়াতে তাঁরাই সাড়া দিয়েছেন যাঁরা হজরত মুহাম্মদ (সা.)-কে খুব কাছে থেকে দেখেছেন। যেমন -হজরত খাদিজা (রা.), হজরত আবু বকর (রা.) ও হজরত আলী (রা.) প্রমুখ।

আল্লাহর নির্দেশের প্রেক্ষিতে প্রকাশ্যে দাওয়াত দানের লক্ষ্যে তিনি মানুষকে একটি পাহাড়ের পাদদেশে একত্রিত করে বলেন, ‘আমি যদি তোমাদের বলি এই পাহাড়ের অপর পার্শে তোমাদের আক্রমণ করার জন্য এক সেনাবাহিনী ওত পেতে আছে। তোমরা কি তা বিশ্বাস করবে?’ সমস্বরে সবাই বলে ওঠে, অবশ্যই। কারণ তুমি তো আল আমিন ও আস সাদিক, জীবনে কখনই মিথ্যা বলনি।’ তাহলে আমি তোমাদের এক ভয়াবহ আযাব সম্পর্কে সতর্ক করছি এবং তা থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য তোমরা সবাই মিলে বল- ‘আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই, তাহলে তোমরা সফলকাম হবে।’ তাঁর আপন চাচা আবু লাহাব হজরত মুহাম্মদ সা.-এর জন্মের খবর যে দাসী তাকে দিয়েছিল সে খুশি হয়ে তাকে মুক্ত করে দিয়েছিল) বলে ওঠে- ‘হে মুহাম্মদ, তোমার সর্বনাশ হোক! সাত-সকালে এই কথা শোনানোর জন্য আমাদের ডেকে এনেছ।’ এরপর তাঁর দাওয়াত দানের পরিধি বাড়তে থাকে এবং সাথে সাথে বাড়তে থাকে তাঁর ও তাঁর সাথীদের প্রতি জুলুম-নির্যাতন। তিনি তাঁর জাতির সাথে কখনোই গাদ্দারি করেননি বা তাঁর চরিত্রে ছিল না সামান্যতম কোন কালিমা।

প্রশ্ন জাগে, এত ভালো এই মানুষটির সাথে শত্রুতার কারণ কী? জাতির একজন কল্যাণকামী হিসেবেই তো তিনি সবার কাছে পরিচিত এবং তিনি কেবল আল্লাহর একত্ববাদ, তাঁর উলুহিয়াত (সার্বভৌমত্ব) এবং রেসালাত ও আখিরাতে বিশ্বাসের দিকে মানুষকে আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি তো সুদ-ঘুষ, জেনা-ব্যভিচার বা অন্য কোনো আচরণের বিরুদ্ধে বা কোনো আচার-অনুষ্ঠানের প্রতিও আহ্বান জানাননি। সকল নবীর যে আহ্বান ছিল তিনিও একই আহ্বান তাঁর জাতির কাছে পেশ করেছেন। আসলে যাদের কাছে এই আহ্বান জানানো হয়েছে তারা বুঝেছে যে, এটা সাধারণ কোনো ধর্মীয় বাক্য নয়, এটা একটি বিপ্লবাত্মক সেøাগান যার মধ্যে রয়েছে সমাজ পরিবর্তনের আহ্বান। তাই প্রথমেই বাধাটা আসে শাসক ও শোষকগোষ্ঠী থেকে এবং তাদের অনুগ্রহপুষ্ট ধর্মীয় ও কায়েমিস্বার্থবাদী গোষ্ঠীর পক্ষ থেকে। রাসূল (সা)-এর বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়, তিনি তাদের ধর্ম মানেন না এবং তাদের দেবদেবী ও আচার-অনুষ্ঠানকে মন্দ বলেন (আমাদের ভাষায় ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানা) এবং পরিবারের মধ্যে অর্থাৎ পিতা-পুত্র, স্বামী-স্ত্রী ও ভাই-ভাই এ বিভেদ সৃষ্টি করছেন। সে সময়ে সকল বাধা-বিপত্তি ও সমালোচনা-নিন্দাবাদ উপেক্ষা করে তিনি শুধু ইতিবাচক কাজ করেন এবং সকল নিপীড়ন-নির্যাতন নীরবে সহ্য করে গেছেন, কোনো একটির পাল্টা জবাব দেননি। এত প্রতিকূল অবস্থার মাঝে আল্লাহর কিছু বান্দাহ তাঁর ডাকে সাড়া দেন।

তিনি আখিরাতের বিশ্বাসের ভিত্তিতে তাঁর সাথীদের পরিশুদ্ধ করেন, অর্থাৎ মৌলিক মানবীয় গুণে সজ্জিত করেন। আমরা যদি মক্কী যুগের সূরাগুলো খেয়াল করি তাহলে দেখবো, নানাভাবে সেখানে মানুষের মধ্যে তাওহীদ, রেসালাত ও আখিরাতে বিশ্বাসের সাথে নেক আমলের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে। সূরা আছরে বলা হয়েছে, সবাই ধ্বংস ও ক্ষতির মধ্যে নিমজ্জিত; তারা ছাড়া যারা ঈমান, নেক আমল ও অপরকে হকের পথে উদ্বুদ্ধ ও ধৈর্য ধারণের তাগিদ দিয়েছে। নেক আমল অত্যন্ত বিস্তৃত এবং এর একটি সর্বজনীন রূপ আছে, যা আল্লাহ মানুষের প্রকৃতিতে দিয়ে রেখেছেন। যেমন সত্য কথা বলা, ওয়াদা-প্রতিশ্রুতি পালন, আমানত সংরক্ষণ (দায়িত্ব পালনে নিষ্ঠাবান হওয়াও আমানতের অংশ), ধোকা-প্রতারণা না করা (ওজনে কমবেশি বা ভেজাল না দেয়া, মিথ্যা কসম না খাওয়া ইত্যাদি), সুদ-ঘুষ ও নানাবিধ অনৈতিক কাজ থেকে দূরে থাকা এবং মানুষের সাথে সদাচরণ করা। যেমন সূরা হুমাযায় বলা হয়েছে, মানুষকে গালি দেয়া, কারো নিন্দাবাদ করা, হেয় করা, অপমান করা সবই গুনাহের কাজ এবং এর পরিণতি হুতামা।

রাসূল (সা.)-এর দাওয়াতে যারা সাড়া দিয়েছেন তাদের তিনি কুরআনের আলোকে ঈমানের সাথে নেক আমলে সমৃদ্ধ করেছেন। তাঁর কাজ হিসেবে কুরআনে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘তিনি মানুষকে আল্লাহর আয়াত তেলাওয়াত করে শোনান ও তাদের পরিশুদ্ধ করেন।’ আমরা রাসূল (সা.)-এর দীর্ঘ ১৩ বছরের মক্কীজীবন পর্যালোচনা করলে দেখতে পাবো, তিনি সে সময়ে এক তরফাভাবে নিপীড়ন-নির্যাতন সহ্য করেছেন-বন্দিত্ব যাপন (শে’বে আবু তালিব) করেছেন, সঙ্গী-সাথীদের হিজরত উদ্দেশ্যে আবিসিনিয়ায় পাঠিয়েছেন এবং একপর্যায়ে তিনি নিজেও মদীনায় হিজরত করতে বাধ্য হয়েছেন। এই সুদীর্ঘ সময়ে একটি ঘটনাও এমন পাওয়া যায় না, ইসলামের কোনো দুশমনকে তিনি গোপনে হত্যা করেছেন বা শারীরিকভাবে আঘাত করেছেন। এটা শুধু ইতিহাসই নয়, আল্লাহর অভিপ্রায়ও তাই- ‘তোমাদের হাত গুটিয়ে রাখ এবং নামাজ কায়েম করো।’

আল্লাহপাক কুরআন মজিদে নবী-রাসূলদের যে ইতিহাস উল্লেখ করেছেন তাতে দেখা যায়, সবারই নিপীড়ন-নির্যাতনের কাহিনীই সবিস্তারে উল্লেখ করেছেন এবং জালেমদের শায়েস্তা করার দায়িত্ব নিজে গ্রহণ করেছেন। যেমন নমরুদ, ফেরাউন, শাদ্দাদের মতো স্বৈরশাসক এবং আদ, সামুদের মতো বিপর্যয় সৃষ্টিকারী জাতিকে তিনি নিজেই সমূলে ধ্বংস করে দিয়েছেন। রাসূল (সা)-এর জীবনে যুদ্ধ-বিগ্রহ সবই ছিল মদীনায় ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পরবর্তী সময়ে। ইসলামী রাষ্ট্রের ধ্বংস সাধনে এগিয়ে আসা শত্রু বা আল্লাহর দ্বীন গ্রহণে প্রতিবন্ধকতা দূরীকরণে তিনি নিজে যুদ্ধ করেছেন এবং যুদ্ধের জন্য তাঁর সাথীদের উদ্বুদ্ধ করেছেন। মাদানী আয়াতসমূহে যুদ্ধ-জিহাদের কথা বার বার এসেছে এবং এর থেকে সামান্যতম দূরে অবস্থান মুনাফিকের জীবন বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। সশস্ত্র যুদ্ধ বা অস্ত্র হাতে লড়াই করার অধিকার কেবল রাষ্ট্রশক্তিরই রয়েছে। বর্তমানে দেশে দেশে যে চোরাগোপ্তা হামলা বা সশস্ত্র যুদ্ধ চলছে এর সাথে ইসলামের কোনো সম্পর্ক নেই বা নবীর ইসলাম প্রচারের পদ্ধতির সাথেও কোনো মিল নেই। এ সবই ইসলামের দুশমনদের ষড়যন্ত্র-চক্রান্ত এবং যারা ইসলামের নামে করছে হয় তারা বিভ্রান্ত, নয়তো ইসলামের দুশমনদের উচ্ছিষ্টভোগী ও ক্রীড়নক।

উপরের আলোচনায় আমরা স্পষ্ট করার চেষ্টা করেছি দাওয়াত দানের ক্ষেত্রে রাসূল (সা.) স্বাভাবিক প্রক্রিয়া অবলম্বন করেছেন। অর্থাৎ তিনি মানুষের কাছে তাওহীদ, রেসালাত ও আখিরাতের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন এবং যারা সাড়া দিয়েছেন তাঁদের পরিশুদ্ধ করে তাদেরও দাওয়াতের কাজে ব্যবহার করেছেন। এই দাওয়াতের মধ্য দিয়ে যথার্থ পরিশুদ্ধির কাজটি সম্পন্ন হয়। তাঁদের কথা ও কাজে পুরোপুরি মিল ছিল এবং তাঁরা ছিলেন নিঃস্বার্থবান। কথা ও কাজে গরমিল আল্লাহর বড়ই অপছন্দনীয়। তাঁর জিজ্ঞাসা- ‘এমন কথা কেন বলো যা নিজেরা করো না? এটা আল্লাহর বড়ই ক্রোধ উদ্রেগকারী বিষয় যে, তোমরা যা বলো তা নিজেরা করো না।’ সকল আম্বিয়ায়ে কেরাম ও তাঁর সাথীদের চরিত্র এমনই ছিল। সূরা ইয়াছিনে বলা হয়েছে, ‘আনুগত্য করো সেই লোকদের যারা নিজেরা হেদায়াতের ওপর প্রতিষ্ঠিত ও কোন বিনিময় আশা করেন না।’ দাওয়াত শুধু মৌখিক নয়, আমলী দাওয়াত হতে হবে। একজন দ্বায়ী ইলাল্লাহকে তার আচার-আচরণ, লেনদেন, কথাবার্তা, ব্যবসা-বাণিজ্য, চাকরি সকল ক্ষেত্রে নিজেকে ইসলামের মূর্ত প্রতীক হিসেবে পেশ করতে হবে। কবি নজরুল যথার্থই বলেছেন, ‘ইসলাম সে তো পরশ মানিক, তারে কে পেয়েছে খুঁজি, পরশে যারা সোনা হলো মোরা তাদেরই বুঝি।’ সকল বাধা-বিপত্তি মাড়িয়ে মৌখিক ও আমলী দাওয়াতের মধ্য দিয়ে ইসলামের অগ্রযাত্রা অব্যাহত থাকবে, একে রোধ করার শক্তি কারো নেই।

ইসলাম আমাদের কাছে বর্তমানে পূর্ণাঙ্গভাবে রয়েছে। মানুষের কাছে ইসলামের শ্রেষ্ঠত্ব তুলে ধরে নিজেদের জীবনে এর অনুসরণ এবং অন্যদের কাছে তা পৌঁছে দেয়ার আহ্বান জানাতে হবে। ইসলামকে সহজভাবে মানুষের কাছে পেশ করতে হবে। মানুষের যোগ্যতানুসারে আল্লাহর আদালতে বিচার হবে। সাধারণ মানুষের অবস্থানটা ইসলামের পক্ষে (অর্থাৎ ইসলামই শ্রেষ্ঠতম ব্যবস্থা এবং এর মধ্যেই মানবজাতির কল্যাণ এতটুকু বিশ্বাস) এবং মৌলিক ইবাদতে অভ্যস্ত হলেই তাদের জন্য জান্নাতের ফয়সালা আশা করা যায়। রাসূল (সা.)-এর কাছে একজন বেদুইন এসে ইসলাম সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি ঈমানের সাথে নামাজ, রোজা, জাকাত ও হজ (ফরজ হলে) পালনের কথা বললে তিনি বলেন ‘আমি এর বেশিও করবো না, কমও করবো না।’ লোকটি চলে যাবার পর রাসূল (সা.) বলেন, লোকটি সত্য বলে থাকলে সে জান্নাতি। কোনো দেশে ইসলাম প্রতিষ্ঠার জন্য দু’টি শর্ত অপরিহার্য। একদল যোগ্য নেতাকর্মী যারা ঈমানের বলে বলিয়ান ও নেক আমলে সমৃদ্ধ হবে এবং দ্বিতীয়ত অনুকূল পরিবেশ অর্থাৎ জনগণ সক্রিয় বিরোধী না হয়ে ইসলামের পক্ষে হবে। মক্কায় প্রথম শর্ত পূরণ হলেও দ্বিতীয় শর্তটি না থাকায় একজন নবী ও রাসূল হওয়া সত্ত্বেও হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর পক্ষে ইসলাম প্রতিষ্ঠা সম্ভব হয়নি।

পক্ষান্তরে দু’টি শর্তই পূরণ হওয়ায় মদীনায় ইসলাম প্রতিষ্ঠা সম্ভব হয়েছে। মুমিনদের এ কথাও মনে রাখতে হবে যে, নবী প্রেরণের উদ্দেশ্যই মূলত সকল ব্যবস্থাপনার ওপর ইসলামকে বিজয়ী করে দেয়া। এ ব্যাপারে আল্লাহর বক্তব্য দ্ব্যর্থহীন- ‘তিনি আপন রাসূলকে হেদায়াত ও সত্যদ্বীনসহ প্রেরণ করেছেন যাতে সকল প্রকার দ্বীনের ওপরে আল্লাহর দ্বীনকে বিজয়ী করতে পারেন, যদিও শিরকবাদীগণ মোটেই বরদাশত করবে না।’ (সূরা সফ)। আল্লাহর দ্বীনকে বিজয়ী করার টার্গেট নিয়ে মানুষকে ইসলামের পক্ষে আহ্বান জানাতে হবে এবং দ্বীনের ফরজ-ওয়াজিব পালন ও কবীরা গুনাহ থেকে দূরে থাকার জন্য উদ্বুদ্ধ করতে হবে। সুন্নাত-মুস্তাহাব পালনের বিষয়টি ব্যক্তির স্বতঃস্ফূর্ততার ওপরে ছেড়ে দিতে হবে। আমাদের সমাজে ফিকহ মাসলা-মাসায়েল নিয়ে বেশ মতপার্থক্য রয়েছে এবং এগুলো গৌন বিষয় বলেই মতপার্থক্যের সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু ফরজ-ওয়াজিব ও কবীরা গুনাহের ব্যাপারে কোনো মতপার্থক্য নেই। দ্বীনের মাঝে মতপার্থক্য সৃষ্টি করাকে আল্লাহপাক তাঁর কিতাবে কুফুরি বলে উল্লেখ করেছেন। (সূরা আলে ইমরান : ১০৫-১০৭)। এ দেশে দ্বীন প্রতিষ্ঠা করতে চাইলে উম্মাহর মতপার্থক্য অবশ্যই কমিয়ে এনে বৃহত্তর ঐক্য সৃষ্টি করতে হবে। আল্লাহপাক যে কাজটি এড়িয়ে গেছেন এবং রাসূল (সা.) তাঁর উম্মতের জন্য যেটা বাধ্য করেননি সেটা নিয়ে বাড়াবাড়ি করা কখনোই দ্বীনের জন্য কল্যাণকর নয়। এগুলো সবই পরিপূরক এবং ছাওয়াব মনে করে উম্মাহ স্বতঃস্ফূর্তভাবে সেগুলো পালন করবে এবং অতীতেও করে আসছে।

দাওয়াত দানের ক্ষেত্রে আত্মবিশ্বাসী হতে হবে। মুহাম্মদ (সা.) তাঁর জাতিকে শুনিয়েছিলেন, তোমরা যদি এ দ্বীন গ্রহণ করো, তাহলে আরবের নেতৃত্ব তোমাদের হাতে চলে আসবে এবং সমগ্র দুনিয়া তোমাদের বশ্যতা স্বীকার করবে। দ্বীন গ্রহণের ফলে সাহাবায়ে কেরাম (রা.)-এর জীবন বড় সংকীর্ণ হয়ে পড়েছিল। স্বাধীনভাবে চলাফেরা ও ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। দরিদ্র শ্রেণীর মুসলমানদের জীবন আরো কঠিন হয়ে পড়েছিল। রাস্তাঘাটে মারপিট, মন্দ কথা শোনা ছিল স্বাভাবিক ব্যাপার। অত্যাচার-নির্যাতনে জর্জরিত হয়ে একদিন তাঁরা খানায়ে কাবায় বিশ্রামরত রাসূল (সা.)-কে বলেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ (সা.)!

আমরা তো আর সহ্য করতে পারি না। আমাদের জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করুন। জবাবে রাসূল (সা.) বলেন, অতীতকালেও যারা আল্লাহর দ্বীন কবুল করেছিল তাদের কাউকে করাতে দ্বিখ-িত ও কারো শরীর থেকে লোহার চিরুণী দিয়ে গোশত পৃথক করা হয়েছিল, তারপরও তারা দ্বীন থেকে বিচ্যুত হননি। সেদিন বেশি দূরে নয় যেদিন সানআ থেকে হাজরা মাউত পর্যন্ত এক ষোড়শী স্বর্ণালঙ্করসহ একাকী হেঁটে যাবে তাকে আল্লাহ ছাড়া আর কাউকে ভয় করতে হবে না। রাসূল (সা.) তাঁর সাথীদের স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন এবং তাঁরা পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাসের সাথে সেই স্বপ্ন পূরণের লক্ষ্যে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। এখানে রাসূল (সা.) একটি ইসলামী সমাজের চিত্র তাদের সামনে পেশ করেছেন এবং সেটা হলো সকলের জন্য একটি নিরাপদ সমাজ; যে সমাজে ভয়ভীতি বা কোন জুলুম-নির্যাতন থাকবে না, জীবন-সম্পদ-সম্মানের পূর্ণ নিরাপত্তা নিয়ে সকলে জীবনযাপন করতে পারবে।

আর আল্লাহও মুমিনদের প্রতিশ্রুতি প্রদান করেছেন যে, ঈমান ও নেক আমলে সমৃদ্ধ হলে জমিনে তিনি তাদের খেলাফত দান করবেন ও ভয়ভীতি দূর করে দেবেন। (সূরা নূর : ৫৫)। আর গোনাহসমূহ ক্ষমা করে জান্নাতের ওয়াদা তো রয়েছেই। যারা জমীনে ইসলামী খেলাফত প্রতিষ্ঠা করতে চায় তাদের অবশ্যই রাসূল (সা.) প্রদর্শিত পথেই অগ্রসর হতে হবে। অর্থাৎ মানুষের কাছে হেকমতের সাথে দ্বীনের দাওয়াত (আল্লাহর সার্বভৌমত্বের প্রতি) পৌঁছাতে হবে এবং যারা সাড়া দেবে তাদের পরিশুদ্ধ করতে হবে (মৌলিক মানবীয় গুণের অধিকারী হতে হবে)। ঈমান ও মৌলিক মানবীয় গুণে (নেক আমল) সমৃদ্ধ একটি জনগোষ্ঠী কোন জনপদে থাকলে সহজেই তারা সাধারণ মানুষের মন জয় করতে পারে এবং এটা সম্ভব হলে আল্লাহপাকও তাঁর প্রতিশ্রুতি পূরণে এগিয়ে আসবেন। আল্লাহপাক আমাদের তাঁর দ্বীনের ওপর অবিচল থেকে পূর্ণ মুসলিম হিসেবে জীবনযাপনের তাওফিক দান করুন। আমিন।

লেখক :প্রফেসর তোহুর আহমদ হিলালী, উপাধ্যক্ষ (অব.), কুষ্টিয়া সরকারি কলেজ।কার্টেসীঃ সাপ্তাহিক সোনার বাংলা, সীরাত সংখ্যা ২০১৭

Leave A Reply