দুই সংক্রমণ মোকাবেলায় প্রস্তুতির অভাব

0

করোনার পাশাপাশি শুরু হয়েছে ডেঙ্গুর সংক্রমণ। দুটি রোগের বিস্তারই ক্রমেই বেড়ে চলেছে। ইতোমধ্যে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে ৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। অব্যাহত আছে কোভিড-১৯ এ মৃত্যু।

প্রয়োজনীয় প্রস্তুতির ঘাটতির কারণে কোনো সংক্রামক রোগই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হচ্ছে না বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

তারা বলছেন, দেশে কোভিড শুরুর পর থেকেই একাধিক বিষয়ে বিশেষজ্ঞরা শঙ্কা প্রকাশ করেছেন। এর মধ্যে করোনার সঙ্গে ডেঙ্গুর সংক্রমণের কথাও ছিল। তারা সেভাবে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে প্রস্তুতি নিতে প্রয়োজনীয় পরামর্শও দেন।

কোভিডের পাশাপাশি নন-কোভিড চিকিৎসা সমানভাবে চালানোর প্রস্তুতি নিতে বলা হয়। কিন্তু প্রস্তুতির ঘাটতির কারণে সংক্রামক রোগগুলোয় আক্রান্ত ও মৃত্যু বাড়ছে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে শুধু কোভিড নিয়ন্ত্রণেই বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণের কথা বলা হয়েছে; কিন্ত সেগুলো মানা হচ্ছে না। দেশে সন্দেহভাজন রোগীদের কোয়ারেন্টিন এবং শনাক্ত রোগীদের আইসোলেশন নিশ্চিত করা হয় না।

সব জেলায় এখনও পরীক্ষার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়নি। জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটি একাধিকবার বলার পরও শুরু হয়নি অ্যান্টিজেন পরীক্ষা। এমনকি সরকারের পক্ষ থেকে ‘নো মাস্ক নো সার্ভিস’ ঘোষণা করা হলেও সেটি বাস্তবায়ন হচ্ছে না।

পাশাপাশি ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে নিয়মিতভাবে যেসব কার্যক্রম পরিচালিত হওয়ার কথা, সেগুলোও হচ্ছে না। মৌসুমের শুরুর দিকে যে ধরনের কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছিল, সেটি নিয়মিতভাবে হওয়া প্রয়োজন ছিল।

এ বিষয়ে রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের উপদেষ্টা ড. মোশতাক হোসেন যুগান্তরকে বলেন, দেশে কোভিডের পাশাপাশি ডেঙ্গুর প্রদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। দুই সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।

তবে এক্ষেত্রে সরকারের অর্থাৎ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের প্রস্তুতি পরিপূর্ণ নয়। তিনি বলেন, মহামারী মোকাবেলায় শুধু নির্দেশনা জারি করে বসে থাকলেই হবে না। নির্দেশনা বাস্তবায়নে সব ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণে করতে হবে।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপেরেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুম সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরে এ পর্যন্ত ৭৪২ জন রোগী ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন। এর মধ্যে ৬৭৫ জন সুস্থ হয়ে ছাড়পত্র পেয়েছেন।

বর্তমানে ৬২ জন দেশের বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন। এই সময়ে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে ৫ জনের মৃত্যু হয়েছে।

যদিও রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইন্সটিটিউট (আইইডিসিআর) মৃত্যু পর্যালোচনা করে একটি মৃত্যু ডেঙ্গুজনিত বলে নিশ্চিত করেছে।

জানা গেছে, রাজধানীর ৩০টি বেসরকারি হাসপাতালে এ পর্যন্ত ৩০৭ জন রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন। যার মধ্যে বর্তমানে ভর্তি আছেন ৪৭ জন। এছাড়া ১২টি সরকারি হাসপাতালে এ পর্যন্ত ২৭৮ জন ডেঙ্গু রোগীর চিকিৎসা দেয়া হয়েছে।

বেসরকারি হাসপাতালে এ পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি রোগী ভর্তি হয় রাজধানীর সেন্ট্রাল হাসপাতালে ৫২ জন, এরপরই রয়েছে ধানমণ্ডির ইবনে সিনা হাসপাতাল। যেখানে এ পর্যন্ত ২৯ জনের চিকিৎসা হয়েছে।

রাজধানীর বাইরে ঢাকা, চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ ও খুলনা বিভাগে ডেঙ্গুর সংক্রমণ দেখা দিয়েছে। সিলেট ও রাজশাহী বিভাগের ১ জন করে রোগী পাওয়া গেলেও রংপুর বিভাগে এখনও কোনো রোগী পাওয়া যায়নি।

এদিকে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে দেশে গত ২৪ ঘণ্টায় আরও ২৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে নতুন করে রোগটিতে ১৬৮৩ জন শনাক্ত হয়েছে।

এতে দেশে শনাক্ত রোগীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ২১ হাজার ৯২১ এবং এ পর্যন্ত রোগটিতে মোট মৃত্যু হয়েছে ৬ হাজার ৯২ জনের। গত তিনদিনে কোভিডে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা ক্রমাগত বাড়াছে।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের করোনা সংক্রান্ত সমন্বিত নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র থেকে এই তথ্য জানানো হয়েছে। তথ্য অনুযায়ী, ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে ১১৫টি ল্যাবে ১৪ হাজার ৪২টি নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে।

এ পর্যন্ত পরীক্ষা হয়েছে ২৪ লাখ ৫৬ হাজার ৬৪৪টি নমুনা। ২৪ ঘণ্টায় নমুনা পরীক্ষার বিবেচনায় শনাক্তের হার ১১ দশমিক ৯৯ শতাংশ, এ পর্যন্ত মোট শনাক্তের হার ১৭ দশমিক ১৭ শতাংশ। শনাক্ত বিবেচনায় সুস্থতার হার ৮০ দশমিক ৫৩ শতাংশ এবং মৃত্যুর হার ১ দশমিক ৪৪ শতাংশ।

বর্তমানে রাজধানীর সরকারি-বেসরকারি ১৯টি হাসপাতালে কোভিড রোগী ভর্তি আছেন ১৮৬৪ জন। যার মধ্যে মুমূর্ষু অবস্থায় ইনটেন্সিভ কেয়ার ইউনিট (আইসিইউতে) ভর্তি আছেন ১৮১ জন।

এছাড়া চট্টগ্রামে রোগটিতে আক্রান্ত হয়ে ১০টি সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন ১৩৮ জন। এর মধ্যে আইসিইউতে আছেন ১১ জন।

এ প্রসঙ্গে স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদ-স্বাচিপ সভাপতি অধ্যাপক ডা. এম ইকবাল আর্সলান যুগান্তরকে বলেন, কোভিডের পাশাপাশি ডেঙ্গুর সংক্রমণ হতে পারে- এমন আশঙ্কা জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা আগেই করেছিলেন।

যদিও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও অধিদফতর ইতঃপূর্বে ডেঙ্গু মহামারী মোকাবেলা করেছে। কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপটে কোভিডের পাশাপাশি ডেঙ্গু পরিস্থিতি সামলানো সহজ নয়।

এক্ষেত্রে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও অধিদফতরের পূর্ণাঙ্গ প্রস্তুতির ঘাটতি রয়েছে, যা দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর হুমকি হয়ে দেখা দিতে পারে। তিনি বলেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধে উৎস নির্মূল করা প্রয়োজন।

এক্ষেত্রে কিছুদিন আগেও যে ধরনের উদ্যোগ দেখা গিয়েছিল এখন তেমনটা দৃশ্যমান নয়। ফলে মশার উপদ্রব বেড়েছে। সেই সঙ্গে বাড়ছে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা।

এদিকে কোভিড প্রতিরোধে সংক্রমণ ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে বলে মন্তব্য করে তিনি বলেন, বেশির ভাগ মানুষ নিয়ম মানছে না। ফলে দুই সপ্তাহে কোভিডে সংক্রমণের হার বেড়েছে।

সেই সঙ্গে বেড়েছে হাসপাতালে রোগীর চাপ। এগুলো নিয়ন্ত্রণে আনতে রোগের উৎস নির্মূলে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণের পরামর্শ দেন এই বিশেষজ্ঞ।

Leave A Reply